জ্ঞানভিত্তিক পেশাদারী ও গণমুখী জনপ্রশাসন বিনির্মাণে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের করণীয়।
আজ এই ঐতিহাসিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি গর্বিত। আজ এই ঐতিহাসিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি গর্বিত —কারণ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক নতুন যুগসন্ধিক্ষণে; যেখানে স্বাধীনতার চেতনা শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিদিনের রাষ্ট্র পরিচালনায়, আমাদের সংবিধানের শপথে, এবং মানবাধিকারের অঙ্গীকারে প্রাণ পায় নতুন করে।
জনপ্রশাসন শুধু নীতির বই বা কাগজে লেখা নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবন্ত এক দায়িত্ববোধ, যা আমাদের নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে, এবং রাষ্ট্রের সকল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও মানবিকতা নিশ্চিত করে। আজকের বাংলাদেশ, স্বাধীনতার পঞ্চাশ পেরিয়ে নতুন পথে হাঁটছে—যেখানে আমরা চাই এমন এক প্রশাসন, যা হবে জনগণের নির্ভরতার প্রতীক, কর্তৃত্বের প্রতীক নয়; যা মানুষের অধিকার ও সম্ভাবনাকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখে।
আমাদের ভালো লাগার কারণ আরও এই যে, আমরা আলোচনা করতে চলেছি একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়—”জ্ঞানভিত্তিক পেশাদারী ও গণমুখী জনপ্রশাসন বিনির্মাণে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের করণীয়”। এই আলোচনা শুধু তাত্ত্বিক নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার।
প্রশাসনের দর্শন, ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা
“প্রশাসন” শব্দটির গভীর দার্শনিক ও ঐতিহাসিক শেকড় রয়েছে। এর উৎপত্তি লাতিন শব্দ Administrare থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ “সেবা করা” বা “পরিচালনা করা”। এই শব্দটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনকল্যাণ ও সুশাসন নিশ্চিত করা। প্রাচীন সভ্যতাগুলোর বেশকিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল জ্ঞান, ন্যায়নীতি ও দক্ষতার এক অনবদ্য সমন্বয়। মিশরের পিরামিড নির্মাণ থেকে শুরু করে মেসোপটেমিয়ার সিন্ধু সভ্যতার নগর-পরিকল্পনা, কিংবা মৌর্য্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা—সবই প্রমাণ করে যে একটি সুসংহত প্রশাসন ছাড়া কোনো উন্নত সমাজ গড়ে উঠতে পারে না।
খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে রচিত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র প্রশাসনিক তত্ত্বের একটি মৌলিক গ্রন্থে উল্লিখিত ‘’ প্রজার সন্তুষ্টিই রাজার সন্তুষ্টি” বাণীটি শাসনব্যবস্থার মৌলিক দর্শনকে নির্দেশ করে: রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হলো জনগণের সেবা করা। মৌর্য্য সাম্রাজ্যে মন্ত্রীপরিষদ, রাজস্ব ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটি বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসন গড়ে উঠেছিল, যা আধুনিক শাসনব্যবস্থারও পূর্বসূরি।
ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে প্রশাসনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল আদল (ন্যায়) ও আমানত (দায়িত্বশীলতা)। হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে গঠিত দিওয়ান ব্যবস্থা রাষ্ট্রের সম্পদ ও সেবার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করত। তাঁর আমলে প্রতিষ্ঠিত বাইতুল মাল ছিল একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলের অধিকার সংরক্ষিত হতো। পরবর্তীতে মুঘল আমলে আকবরের মনসবদারী প্রথা প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করে।
ব্রিটিশ ভারতে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) ছিল একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত ও কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনিক কাঠামো, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখা। এই ব্যবস্থায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না, বরং এটি ছিল শোষণমূলক ও লালফিতার দৌরাত্মে জর্জরিত। ICS-এর উত্তরাধিকার থেকেই পাকিস্তান আমলে সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) গড়ে ওঠে, যা আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ন ও গণবিচ্ছিন্ন ছিল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (BCS) গঠন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল একটি জনবান্ধব, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। কিন্তু ৫২ বছর পর আজ প্রশ্ন রয়েছে আমাদের সকলেরই মনে। আমরা কী চেয়েছিলাম আর কী পেলাম। অতীত নিয়ে আর চর্বিত চর্বন করতে চাই না বরং ভবিষ্যতে আমরা কী চাই- সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো এ কী নোটে।
ব্রিটিশ আমলের লাল ফিতার দৌড়াত্মক ও জটিল প্রক্রিয়া নয়, আমরা চাই দ্রুতগতিতে নথি চলাচলের সুগম ব্যবস্থা। জনবিচ্ছিন্ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয়, চাই জনবান্ধব, সেবামুখী ও সহজলভ্য শাসনব্যবস্থা। ঊর্ধ্বতনদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য বা চামচামি নয়, চাই আইনের শাসন ও যুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ চেইন অব কমান্ড। জনগণ যেন আর পদদলিত না হয়, বরং আমরা চাই একটি সহানুভূতিশীল, দয়ালু ও জনমুখী প্রশাসন, যেখানে সরকারি সেবা হবে জনগণের আশীর্বাদস্বরূপ।
পাকিস্তান আমলের কেন্দ্রীভূত, স্বৈরাচারী শাসন নয়, চাই ভারসাম্যপূর্ণ ও সুপরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ, যেখানে স্থানীয় সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকবে প্রকৃত ক্ষমতা। বৈষম্যমূলক সেবাব্যবস্থা নয়, চাই সার্বজনীন, সমতাভিত্তিক ও ন্যায়সংগত সরকারি সেবা। জনগণের অসন্তোষ ও হতাশা নয়, চাই তাদের আস্থা ও সন্তুষ্টি। সেনাশাসন বা অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান নয়, চাই গণতন্ত্রের অটুট ধারা ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা বা অবিশ্বাস নয়, চাই একটি জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও আস্থাভাজন শাসনযন্ত্র।
স্বাধীন বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের কাঠামোগত সংস্কারের ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রিতা নয়, চাই সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ সংস্কারের দ্রুত বাস্তবায়ন। প্রশাসনিক দুর্বলতা, জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা নয়, চাই আধুনিক, গতিশীল ও সক্ষম প্রশাসনিক কাঠামো। নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান নয়, চাই সমন্বয় ও সম্পূর্ণ মিলন। দলীয় আনুগত্যে নিয়োজিত কর্মকর্তা নয়, চাই নিষ্ঠাবান, নৈতিকতাসম্পন্ন ও প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের সেবক। আমরা চাই একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র, যা হবে উন্নয়ন ও গণসুখের চাবিকাঠি।
এই সংস্কারকামী দাবিগুলো শুধু কথার কথা নয়—এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে জনবান্ধব, দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার। এসব অঙ্গীকারের কথা বলতে গিয়ে পূর্বেকার কারও দায় বা সীমাবদ্ধতা বলতে চাই না। বলতে চাই না কেবল সমস্যার কথা। বরং বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে জনপ্রশাসন কী করতে পারে ও কীভাবে করতে সে সমাধানের পথ বাতলাতে চাই।
১। জ্ঞানভিত্তিক জনপ্রশাসন তৈরিতে করণীয়
মাননীয় প্রধান অতিথি,সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, সহকর্মী ও বন্ধুগণ,
আজ আমরা এমন এক সময়ে কথা বলছি, যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। যুগ বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, সমাজের প্রত্যাশাও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই টিকে থাকতে ও এগিয়ে যেতে আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো—জ্ঞানভিত্তিক জনপ্রশাসন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জ্ঞানভিত্তিক প্রশাসন কেমন? কেন এটা প্রয়োজন? আর কিভাবেই বা আমরা এটি গড়ে তুলতে পারি?
প্রথমেই স্মরণ করি, রাষ্ট্রদর্শনের এক মহান শিক্ষা: প্রাচীন চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘‘Education breeds confidence. Confidence breeds hope. Hope breeds peace.’’ অর্থাৎ শিক্ষা বা জ্ঞানের মাধ্যমে তৈরি হয় আত্মবিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস আনে আশা, আর আশা তৈরি করে সমাজে স্থিতি ও শান্তি। এটাই প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য—শান্তি, ন্যায় ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। আজকের বাস্তবতায় জ্ঞানভিত্তিক প্রশাসন বলতে বোঝায়—তথ্য, গবেষণা ও বিশ্লেষণনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রযুক্তির সুচারু ব্যবহার, নৈতিকতা, মানবাধিকার ও সংবিধাননিষ্ঠ চেতনা, এবং প্রতিনিয়ত শিখে চলার মনোভাব।
ক) প্রশাসনের জ্ঞান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালা, ই-লার্নিং কোর্স ও আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ চালু করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের Harvard Kennedy School বা Singapore Civil Service College–এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মডেল অনুসরণ করে একটি “Bangladesh Public Administration Knowledge Hub” তৈরি করা যেতে পারে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে মেধা ও জ্ঞানের বিনিময় বাড়াতে হবে। সরকার যদি প্রশিক্ষণ নাও দেয়, কর্মকর্তাদেরকে স্বউদ্যোগে এসব জ্ঞান, দক্ষতা গ্রহণ করতে হবে।
খ) ডেটা ও গবেষণার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন ও বিষয়ভিত্তিক নলেজ হাব তৈরি দরকার। শুধু খামখেয়ালি আদেশ নয়, কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও এস্তোনিয়ার মতো দেশগুলোতে “policy lab” বা নীতি উদ্ভাবন ল্যাবের মাধ্যমে নীতিমালা তৈরি হয় জনগণের অংশগ্রহণ ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। আমাদেরও জাতীয় পর্যায়ে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সেক্টর ভিত্তিক Policy Lab গড়ে তুলতে হবে। নেতৃত্ব, নেগোসিয়েশন, পরিকল্পনা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিষিয়ভিত্তিক একাডেমিক ও প্র্যাক্টিশনার হিসেবে অফিসারদেরকে গড়ে উঠতে হবে।
গ) তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দরকার। এআই (Artificial Intelligence), বিগ ডেটা ও ক্লাউড কম্পিউটিংকে জনপ্রশাসনের কাজে ব্যবহার করতে হবে। যেমন: নাগরিক সেবা দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা। প্রশাসন ক্যাডারের সকল অফিসারকেই ডাটা এনালিটিক্স হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তথা কেবল টেকনিক্যাল ডাটা এনালিসিস নয়, বরং গণিত, পরিসংখ্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ও অর্থনীতির বহুমুখী জ্ঞান অর্জন করে টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত ডাটা এনালিসিস থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
ঘ) মানবিকতা ও নৈতিকতায় প্রাজ্ঞ হতে হবে। প্রশাসন শুধু নীতি আর প্রক্রিয়া নয়—এটি মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। জনপ্রশাসনে দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা জোরদার করতে হবে, যাতে জনগণ প্রশাসনকে বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে দেখতে পায়, প্রভু হিসেবে নয়।
ঙ) জ্ঞান শেয়ার করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। একজন প্রশাসককে আইন, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্ব রাজনীতিতে পারদর্শী হতে হবে। সিঙ্গাপুরের সিভিল সার্ভিস তাদের অফিসারদের হার্ভার্ড, অক্সফোর্ডে পাঠায়।
প্রতিটি কর্মকর্তাকে অভিজ্ঞতা, সাফল্য ও ব্যর্থতা—সবকিছু থেকে শিখে এবং তা অন্যদের শেখানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। এই জন্য ব্লগ, সেমিনার, কনফারেন্স বা অভ্যন্তরীণ আলোচনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
চ) গণতন্ত্র ও সংবিধানের চেতনায় প্রশাসন পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সংবিধান আমাদের রাষ্ট্রের মূল দর্শন দিয়েছে—মানবিক মর্যাদা, সমতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই চেতনা প্রতিটি নীতি ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান যেভাবে knowledge-based bureaucracy তৈরি করে দেশের অর্থনীতি গড়ে তোলে, তা আমাদের জন্য বড় উদাহরণ। ফিনল্যান্ড, যেখানে শিক্ষানীতি ও প্রশাসন হাতে হাত রেখে দেশে মানবসম্পদ গড়ছে। ভারতীয় উপমহাদেশসহ ও বাংলাদেশের প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ ও আমলাদের দেখানো পথ অনুসরণ করে আমাদের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং স্বনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ।- এ দর্শনই জ্ঞানভিত্তিক প্রশাসনের মূল চালিকা শক্তি হতে পারে।
মাননীয় অতিথিবৃন্দ, আমরা যদি সত্যিকার অর্থে তথ্য, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে জ্ঞান ও তথ্য ভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তুলতে পারি—তাহলে শুধু প্রশাসন নয়, পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাই বদলে যাবে। কারণ, ‘‘Knowledge is power’’, ‘‘Information is Power’’—এটি শুধু স্লোগান নয়, একটি বাস্তবতা; আর এই শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলেই আমরা গড়তে পারি স্বপ্নের বাংলাদেশ—যেখানে প্রশাসন জনগণের বন্ধু, ন্যায়ের প্রতীক, উন্নয়নের সহযাত্রী।
২. পেশাদারি জনপ্রশাসন বিনির্মাণে করণীয়:
“পেশাদারি, নৈতিক মনোবলসম্পন্ন ও দক্ষ জনপ্রশাসন”—এটি শুধু একটি প্রশাসনিক আলোচনা নয়, এটি রাষ্ট্রদর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং নৈতিকতার একটি সম্মিলিত পাঠ। আজ আমরা বলতে চাই যে, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, “রাষ্ট্র হলো মানুষের সর্বোচ্চ সমাজিক প্রতিষ্ঠান, যার লক্ষ্য নাগরিকদের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপূর্ণতা অর্জনে সহায়তা করা।” আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য যৌক্তিক-বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা (Rational-Legal System)-এর কথা বলেছেন, যেখানে নিয়মই সর্বোচ্চ, ব্যক্তিগত আনুগত্য নয়। বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর প্রশাসনিক মডেল রয়েছে। সিংগাপুরে লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বে একটি দুর্নীতিমুক্ত, পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে উঠেছে। তাদের Public Service Commission নিয়োগ ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বিশ্বসেরা। ডেনমার্কে তাদের “ডিজিটাল গভর্নেন্স” মডেল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনসেবার গতি বাড়িয়েছে। সেখানে একজন নাগরিক ২৪ ঘন্টার মধ্যে সরকারি সেবা পেয়ে যায়। মালয়েশিয়াতে তাদের “National Integrity Plan” দুর্নীতি দমন ও নৈতিকতা জোরদারে অভূতপূর্ব সাফল্য এনেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে পারি, আমাদের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।” কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে হতে হবে:
ক) পেশাদারিত্বে ভরপুর:
জ্ঞান, দক্ষতা ও গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে শুধুমাত্র আইন ও নীতির আলোকে কাজ করা।
খ) নৈতিকতায় বলীয়ান:
প্লেটো বলেছিলেন, “রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দার্শনিকরা থাকবেন।” কারণ, নৈতিকতাই প্রশাসনের ভিত্তি। রাসূল (স.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে মানুষদের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।” (বুখারী)। আমরা কি দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়পরায়ণ? দুর্নীতি নয়, সততা হোক আমাদের অস্ত্র। জনগণের সম্পদে হাত দেওয়া নয়, বরং তা রক্ষা করাই হোক আমাদের ব্রত।
গ) ডিজিটালাইজেশন ও উদ্ভাবনীতে সক্ষম: সিঙ্গাপুর বা এস্তোনিয়ার মতো ই-গভর্নেন্স চালু করে সেবার গতি বাড়ানো। এআই ও বিগ ডেটা ব্যবহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
ঘ) রাষ্ট্র পরিচালনায় পারঙ্গম হওয়া: রাষ্ট্রের আইন, পলিসি ও দাপ্তরিক পদ্ধতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল ও হালনাগাদ থাকা জরুরি। পাশাপাশি রাষ্ট্রের সকল ভিশন মিশন এবং সেক্টরভিত্তিক পরিকল্পনা ও পলিসিগুলোকে অনুধাবন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় পারঙ্গম হতে হবে।
প্রশাসন কখনই শুধু চাকরি নয়—এটি একটি “সেবার ব্রত”। আমরা যদি ইতিহাসের শিক্ষা, বিশ্বের সেরা অনুশীলন এবং আমাদের সংবিধানের আদর্শকে একত্রিত করতে পারি, তাহলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, নৈতিক ও জনবান্ধব প্রশাসন।
আমাদের সন্তানরা যেন ভবিষ্যতে বলতে পারে—”আমাদের আমলারা শুধু ফাইল চালাতেন না, তারা দেশ বদলে দিয়েছিলেন।”
৩। গণমুখী জনপ্রশাসন বিনির্মাণে জনপ্রশাসনের করণীয়
“ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহান আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যন্ত সকল শাসকই বুঝতে পেরেছিলেন, প্রকৃত শাসনক্ষমতা জনগণের সেবায় নিহিত। ইসলামের খোলাফায়ে রাশেদীন যুগে হযরত উমর (রা.) রাতের অন্ধকারে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে বের হতেন। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নাগরিকদের সুখ নিশ্চিত করা’। জন লক তার ‘সামাজিক চুক্তি’ তত্ত্বে বলেছেন, ‘শাসকগণ জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা পায় জনগণের সেবার জন্য’। বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে – ‘প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মে জনগণের সেবা করা হবে’।”
সিঙ্গাপুরে পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি সূচকে আমরা কী দেখি? একজন নাগরিক জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক লাইসেন্স পেতে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট সময় নেন। ডেনমার্কে ই-গভর্নেন্সের মাধ্যমে ৮৯% সরকারি সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ার ‘ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রাম’ প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অনন্য উদাহরণ।
এস্তোনিয়ায় ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের রোল মডেল স্থাপন করেছে। ই-রেসিডেন্সি চালু করেছে তথা বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ডিজিটাল নাগরিকত্ব চালু করে, যেখানে যে কেউ অনলাইনে এস্তোনিয়ার ই-সেবা পেতে পারে। নিউজিল্যান্ড জনগণের আস্থায় শীর্ষস্থানে রয়েছে সরকারি সেবা। “Wellbeing Budget”: জিডিপি নয়, নাগরিকদের সুখ-স্বাস্থ্যকে বাজেটের মূল ফোকাস ধরা হয়েছে। কানাডাতে বহুসংস্কৃতি বান্ধব প্রশাসন রয়েছে। সেবার বহুভাষিকতা: সরকারি সেবা ইংরেজি-ফরাসির পাশাপাশি আদিবাসী ভাষায়ও দেওয়া হয়। “Service Canada Centres”: এক ছাদের নিচে ৪০+ ধরনের সেবা, যেখানে নাগরিকরা ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ পায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। “Anti-Corruption Initiative”: দুর্নীতির অভিযোগ দিলে রিপোর্টারকে পুরস্কৃত করা হয়। ই-পিপল সিস্টেমে যে কেউ অনলাইনে আমলাদের কাজের মূল্যায়ন করতে পারে, যা তাদের প্রমোশনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
ফিনল্যান্ডে শিক্ষা ও সমতা ভিত্তিক মডেলে “Experiment Finland”: সরকারি সেবার নতুন ধারণা প্রথমে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে চালু হয় জনমত নিয়ে। বেকার ভাতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে বেকাররা ৩ ক্লিকেই ভাতা পায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে AI প্রশাসনে ভার্চুয়াল AI মন্ত্রী ২০১৭ সালে চালু হয়, যা জনগণের প্রশ্নের রিয়েল-টাইম জবাব দেয়। “One-Day Government”: ৫০% সরকারি সেবা ২৪ ঘন্টার মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য। ডেনমার্ক: অংশগ্রহণমূলক শাসন: “Citizen Assemblies”: জলবায়ু নীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা সংস্কার—জনগণের সরাসরি ভোটে সিদ্ধান্ত হয়।
এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বাংলাদেশে দরকার প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ, সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি, সুখ ও কল্যাণভিত্তিক পরিমাপ করার মাধ্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করা। লি কুয়ান ইয়ু বলেছেন “একটি দেশ তখনই উন্নত হয়, যখন তার প্রশাসন জনগণের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়।” আমাদের ই-গভর্ন্যান্স, স্থানীয় সরকারে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা হস্তান্তর, AI ও বিগ ডেটার ব্যবহার , জনমুখী বাজেটিং ইত্যাদি বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রিয় সহকর্মীগণ, গণমুখী জনপ্রশাসন করতে হলে
ক) প্রথমত, আমাদেরকে ‘সেবক’ মানসিকতা ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে- ই-ফাইলিং থেকে শুরু করে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার। তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে হবে। চতুর্থত, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।”
খ) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে’। আমাদের পূর্বসূরি আমলারা যেভাবে দেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন, আজ আমাদেরকেও সেই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। মনে রাখবেন, বিসিএস ক্যাডার হিসেবে আমাদের পরিচয় হবে ‘জনসেবক’ – আমলা নয়।”
“আসুন, আমরা শপথ নিই – বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের মুখে হাসি ফোটানোর, প্রতিটি গ্রামে উন্নয়নের আলো পৌঁছে দেওয়ার। কারণ, জনগণই আমাদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক, আমরা কেবল তাদের সেবক।”
গ) একজন ডিসি যখন মাঠে নামেন, তিনি শুধু অফিসার নন—একজন সংগঠক, সমস্যা সমাধানকারী। একজন জেলা প্রশাসক বন্যায় নিজে নৌকা চালিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেন, তখন সেটাই গণমুখী প্রশাসন। স্থানীয় সরকারের শক্তিশালীকরণ হলে সেবা দ্রুত দেওয়া সম্ভব হবে। কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “স্বাদেশিকতা থেকেই বিশ্বনাগরিকতা।”
ঘ) স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সকল জনপ্রতিনিধির সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। স্টেকহোল্ডারদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করো।” (সূরা আল-ইমরান: ১৫৯)।
ঙ) নরওয়ে, কানাডায় পাবলিক পলিসি তৈরিতে নাগরিকদের মতামত নেওয়া হয়। আমাদেরও গ্রাম সভা, ওয়ার্ড সভা বাড়াতে হবে। জবাবদিহিতার আওতায় সোশ্যাল অডিট, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের সাথে খোলামেলা সংলাপ বাড়াতে হবে।
ঙ) দক্ষতার ঘাটতি পূরণকল্পে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রশাসনিক দক্ষতায় আমরা পিছিয়ে। সমাধান? নিবিড় প্রশিক্ষণ, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জন ও তা বাস্তবায়নে সক্ষম হওয়া।
চ) আলোকিত প্রশাসনের দিকে ধাবিত হতে হবে। মহানবী (স.) বলেছেন, “সবাই দায়িত্বশীল, এবং সবাই তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী)। আমরা যদি জ্ঞান, নৈতিকতা ও সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করি, তাহলেই বাংলাদেশ হবে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
.
পরিশেষে বলতে চাই, জ্ঞানভিত্তিক পেশাদারী ও গণমুখী জনপ্রশাসন বিনির্মাণে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সকল কর্মকর্তাকে যুগোপযোগী জ্ঞানার্জন ও প্রশিক্ষণ নিতে হবে, সৃষ্টিশীলতা ও নেতৃত্বে বেঞ্চমার্ক প্রদর্শন করতে হবে। এ লক্ষ্যে ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তাগণ সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা নিয়ে দেশপ্রেম উজ্জীবিত হয়ে আত্মনিয়োজ করে কাজ করবে।
