গল্প: ‘আনচান’ – সফিকুল ইসলাম
লুনার বয়স ত্রিশ পেরিয়ে চল্রিশের দিকে ধাবিত। সরকারি কর্মকর্তা তথা একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক। একটি সরকারি ট্যুরে সিংগাপুরে এসছে। ইদানিং সরকারি কর্মকর্তাদের পোয়াবারো। কথায় কথায় বিদেশ প্রশিক্ষণে যায়। প্রশিক্ষণ নাম মাত্র। ভ্রমণ, শপিং, ঘুরাঘুরিই মূল। প্রশিক্ষণ ওছিলামাত্র। সুন্দর নাম আছে এর। উন্নত দেশের এক্সপোজার। তা অবশ্য হয়। বাইরের এক্সপোজার হলে কিছু পরিবর্তনতো হয়ই। যদিও কিছু কিছু প্রশিক্ষণ আসলেই হাস্যকর। যেমন খিচুড়ি রান্না শিখতে ভারত ভ্রমন। যাক লুনা অবশ্য এরকম নামমাত্র প্রশিক্ষণে আসে নি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বৃদ্ধি ও টেকসিই উন্নয়ন নিয়ে সিংগাপুরের অভিজ্ঞতা নিতেই এসছে। সিংগাপুর এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সিংগাপুর ইউনিভার্সিটির নামকরা প্রফেসরগণ এ কোর্সের আয়োজক। সুতরাং তাঁদের নিশ্চয়ই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, সফল উদাহরণ, বাস্তব অনুশীলন নিয়ে জ্ঞানভান্ডার আছে। না থাকলে বিতরণ করতে যাবে কেন?
সেই প্রশিক্ষণেরই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে হোটেলের কনফারেন্স কক্ষে। প্রোগ্রামে এসে লুনা বুঝতে পারে যে এখানে একই ইউনিভার্সিটির দুটো কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। কারণ দুটো দলই বাংলাদেশ থেকে আগত। অন্য দলটি গভর্ণেন্স ইস্যুতে প্রশিক্ষণ নেবে। আর লুনার দল শিক্ষার উন্নয়ন। লুনা তার টিমের দলনেতা। অন্যদলে অন্যজন দলনেতা। প্রতিটি দলেই পনেরো জনের অধিক অফিসার। স্বাগত বক্তব্য দিয়ে কোর্স পরিচালক অনুষ্ঠান শুরু করলেন। এরপরেই দলনেতা হিসেবে লুনার পুরো নাম ঘোষণা করা হয়। নামটি ঘোষণার সাথে সাথে বাঁ পাশের বেঞ্চের একজনের চোখ তার উপর নিবদ্ধ হয়ে যায়। এত দ্রুত লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায় যে লুনাও অবাক হয়ে যায়। লোকটির নাম জহির। জহিরের চোখে মুখে প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে লুনা এখানে কীভাবে কেন? আর লুনার মনেও প্রশ্ন জহির সাহেব এখানে কেন? লুনার বুক ধ্বড়ফর করা শুরু হয়। কিন্তু কিছু করার নেই। মঞ্চে ডাক পড়ে গেছে। সুতরাং তাঁকে যেতে হবে মঞ্চে। মঞ্চে গিয়ে স্বভাবসুলভ স্বাভাবিকতায় সে বক্তৃতা শুরু করে। মাঝে মাঝেই লোকটির দিকে চোখ যায়। কিন্তু লোকটি তার দিকে আর তাকায় না। সেটা খেয়াল করে লুনা। বক্তৃতা স্মার্টলি চালিয়ে যায়। বক্তব্য শেষে লুনা নিজ আসনে বসে। মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকে যায়। ইনবক্সে নক করে জহিরকে।
:আসসালামু আলাইকুম।
: ওয়ালাইকুম সালাম।
:কেমন আছেন?
: ভালো। আপনি কেমন আছেন?
ফরমাল রিপ্লাই দেখে লুনার আর কথা বাড়ানোর ইচ্ছা হয় না।
দুজনেই ক্লাসে মন দেয়। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে জহির মাঝে মাঝে দেখে ঘার কাত করে লুনা কী করে। লুনাও নির্দিষ্ট সময় পরপর জহিরের গতিবিধি লক্ষ্য করে। চোখে চোখ পড়ে। আবার ফিরিয়েও নেয়। হাসি বিনিময় হয়। তবে সেই হাসি ফরমাল নাকি নরমাল তা ঠাহর করা যায় না।
জহির মন দিয়ে কী যেন টাইপ করে ল্যাপটপে। লুনা পরে ইনবক্সে নক করে।
:কী এত লিখেন ল্যাপটপে?
:গল্প লিখি।
:কী গল্প? কী নিয়ে?
জীবনের গল্প। জেতার গল্প, হারার গল্প। কিংবা যারা হারেও না জেতেও না তাদের হিজরা টাইপ গল্প।
: ক্লাসে বসে গল্প লিখতে হবে কেন? ক্লাসে মন দেন।
: ক্লাসের নোটও নিচ্ছি। গল্পও লিখছি। আবার আপনাকেও দেখছি। আপনার সাথে আমার যা হচ্ছে এখন তাও লিখছি।
:কী হচ্ছে?
:কী হচ্ছে তা প্রশ্ন না করে চোখ বন্ধ করে ভাবুন কী কী হচ্ছে। আমাকে দেখে কি মন বিষন্ন হলো? নাকি উদ্বেলিত হলো? সে প্রশ্নগুলোও নিজেকে করেন।
: কী জানি। আমার কিছু হচ্ছে না।
: তাহলেতো ভালোই। যদি কিছুই না হবে। তবে আমাকে প্রশ্ন করেন কেন? আমি কী লিখি ল্যাপটপে তা জানার জন্য আপনার মন আঁকুপাকু করে কেন? আমরা স্বীকার করি বা না করি। আমাদের মনে কে কখন কী রেখাপাত করে যায় তার কোনো ঠিক নেই।
: আপনি বেশি কথা কন।
:ওকে কথার ইস্তফা দিলাম।
দুজনে আবার ক্লাসে মজে। ক্লাসের আলোচনায় অংশও নেয়। জহির প্রশ্ন করে উত্তর পায়। ক্লাস প্রায় শেষ। ছুটি হবে। শিডিউল টাইম পেরিয়ে গেছে। লুনা উঠে দাঁড়ায় প্রশ্ন করতে। লেডি দাঁড়িয়েছে দেখে লেকচারার আগ্রহ পায়। সুন্দরীদের প্রশ্নের উত্তর দিবে না এমন পুরুষ পৃথিবীতে বিরল। দেশি পুরুষ হোক আর বিদেশী হোক। লুনার প্রশ্ন একটি নয়। কয়েকটি। এদিকে ক্লাসের সবাই চরম বিরক্ত। ক্লাস শেষে সবাই যাবে ঘুরতে। কেনাকাটা করতে। প্রতি মিনিট সময় গুরুত্বপূর্ণ। আর লুনা কিনা ক্লাস টাইমের পরে কয়েকটা প্রশ্ন করে বসেছে। লেকচারার প্রতিটি প্রশ্নের লম্বা উত্তর দিতে লাগলো। আর ক্লাসের সবাই রাগে ফুঁসতেছে। প্রতিট ট্রেনিং এ এরকম কিছু আতেল থাকে। ক্লাস শেষে এদের জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। দুনিয়ার জ্ঞান নিতে আসে। কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। সুন্দরীদেরকে পুরুষরা রাগ দেখাতে পারে না। তবে নিজেরা নিজেরা রাগে গজগজ করতেছে। এরই মাঝে লুনা ইনবক্সে নক করেছে।
: ক্লাসশেষে কোথায় যাবেন?
: যেদিকে দুচোখ যায়।
:খেয়ালি বাদ দিন। সিরিয়াস প্রশ্ন। উত্তর দিন।
: আমার কত সিরিয়াস কথা কতজনে দিনের পর দিন উড়িয়ে দিয়েছে। আমি কেন সিরিয়াস হবো?
:ঠিক আছে সিরিয়াস হওয়ার দরকার নেই। ক্লাস শেষে যেখানেই যান। আমাকে নিয়ে যাবেন।
: আমি নিয়ে যাবো মানে কি? আমি কি ক্যারিয়ার? যার যার পায়ে সে হাঁটবে। যার যার ভেহিক্যালে সে ঘুরবে।
: আমি একা যাবো না। আপনার ট্যাক্সিতে আমাকে নিয়ে যাবেন।
: আমি ক্লাস থেকে এক্ষুণি বের হবো।
: আমি রুমে গিয়ে ব্যাগ রেখে আসবো। লবিতে একটু দাঁড়াবেন। বাই।
লুনা বাই বলে রুমে চলে গেলো। জহির ক্লাস থেকে বের হয়ে লবিতে এলো। লবি থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি ডাকতে গিয়ে ডাকতে পারলো না। অদৃশ্য এক টান তাকে আটকে রাখলো। লুনা আসলো দশ মিনিট পরে। এসেই বিশ্বজয় করা হাসি দিয়ে বললো, ‘‘ কই যেতে পারলেন না আমাকে ফেলে?‘‘। জহির বিব্রত হয়ে চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে বের হয়ে গেলো। ট্যাক্সি ডাকলো। দুজনে ট্যাক্সিতে বসে আছে।
দুজনেই দুদিকের জানালাতে তাকিয়ে আছে। দেখছে সিংগাপুর সিটির দৃশ্য। গাড়ি হাওয়ার বেগে চলছে। ভবন আর বৃক্ষরাজি পেছনে দৌঁড়াচ্ছে। পাশাপাশি বসা দুজন। তবে কথা নেই কারও মুখে। মুখে কথা না থাকলেও মনে মনে কথার খৈ ফুটছে। লুনা ভাবছে যে, এভাবে একসাথে ট্যাক্সিতে উঠা ঠিক হলো কিনা। দেশের কেউ যদি দেখে ফেলে তারা কী ভাববে! কী আর ভাববে? বিদেশের বাড়িতে দুজনে একসাথে ট্যাক্সি শেয়ার করতেই পারে। এটা সাধারণ একটা বিষয়। তবু লুনার বুক কাঁপছে। তবে কি লুনা নিজের ভেতরে কোনোকিছু কাজ করছে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ দশা। জহির সাহেবের প্রতি তার যদি কোনো অন্যরকম ফিলিংস না-ই থাকবে, তবে এরকম আড়স্ট হবার কারণ কী? তাছাড়া জহির সাহেব কী ভাববে? তার সাথে যেচে এরকম ট্যাক্সিতে ঘুরতে যাওয়া, বা নগরীর পর্যটন প্লেসগুলো ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কি ঠিক হলো?ইত্যাকার প্রশ্ন লুনার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে।
লুনার মনে পড়ে আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগের কথা। একটি জেলা শহরে কাজ করতো লুনা। তখন কী করে যেন শক্ত ধাতের লুনার সাথে তারই এক কলিগের সাথে ইয়ে হয়ে যায়। লুনা সরকারি কলেজের প্রভাষক। প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা আর কলিগ কৃষি বিভাগের দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা আবীর। লুনার ইউনিভার্সিটি কলেজ পেরিয়ে চাকুরিতে চলে এসেছে। কখনো কারও সাথে এরকম কিছু ঘটার মতো হয় নি। লুনা সেসবে মন দেয় নি। কিন্তু কী এক কারণে কথা বলতে বলতে কৃষি বিভাগের আবীরের সাথে লুনার ভাব হয়ে যায়। সেসব কথা আশপাশের অনেক অফিসারদের মধ্যে জানিজানি হয়ে যায়। এবং জেলা সদরের অফিসারদের চায়ের আড্ডায় এ প্রসঙ্গ খুব মজা করেই আলোচিত হয়। এরই মধ্যে তাদের বিয়ে হয়ে যায়।
বিয়ের পরে কয়েকদিন ভালোই চলে। এর পরেই আবীরের রূপ পাল্টে যায়। পদে জুনিয়র বলে হীনমন্যতায় ভূগতে থাকে আবীর। আর মিশুক প্রকৃতির সুন্দরী লুনা সবার সাথে সামাজিকতা রক্ষা করে হেসে হেসে কথা বলে বিধায় সন্দেহবাতিক গ্রস্ততায় ধরে তাকে। কথাবার্তার উচ্চবাচ্যতা ছাড়াও মারধরের ঘটানাও ঘটতে থাকে। একদিন দুদিন তিনদিন। লুনার আর সহ্য হয় না। মাসের পর মাস নির্যাতন চলতে থাকে। যেহেতু নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে সেহেতু কাউকে বলতেও পারছে না। বাবা মা বারণ করেছিল। বাবা মার অমতে কর্মস্থলেই কলিগদের নিয়ে বিয়ের প্রোগ্রাম হয় তখন। সুতরাং কিছু করার নেই। দিনের পর দিন সহ্য করতে থাকে। আবীরেরও হীনমন্যতা, ও সন্দেহ বাড়তে থাকে। মারধরও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত অবস্থা তখন বিচ্ছেদের পথ বেছে নেয় লুনা। এ সময়টা একা একা জেলাতে কাটানো ও অফিসে সাধারণ জীবন যাপন করা কঠিনই ছিল। এর মধ্যে বাবা-মার সাথে গিয়ে থেকে দেখেছে। বাবা মা বিচ্ছেদের বিষয়টা মেনে নিলেও পুনরায় বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকে। আছে আত্মীয়স্বজনদের নানান টিপ্পনী। কিন্তু আবীরের সাথে তার কী কী ঘটনা ঘটেছে, এখন সত্যিকার অর্থে কীরকম মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তা বলার মতো কেউ নেই। না ভাই, না বাবা মা, না কোনো বন্ধু বান্ধব, না জেলার কলিগরা। কারণ জেলার কলিগরাও তখন দুভাগে বিভক্ত। কেউ লুনার পক্ষ নেয়, কেউ আবীরের পক্ষ নেয়। এবং তাদের নিয়ে গীবত অপবাদ আর বানানো কাহিনীর ডালপালা ছড়াতে থাকে। লুনার কাছে পৃথিবী বিষময় লাগে। লুনা তখন ওই জেলা থেকে বদলি হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে।
বদলির জন্য কাকে বলা যায় কাকে বলা যায় ভাবতে ভাবতে তখন লুনার মাথায় একজনের নাম আসে। সেই লোকটিই এই জহির সাহেব। লুনা যখন ওই জেলায় প্রথম যোগদান করে তখন জহির সাহেব একটি সিনিয়র পদে ছিলেন। মিশুক প্রকৃতির এ কর্মকর্তা জুনিয়রদের খেয়াল রাখতেন, উতসাহ দিতেন এবং পারিবারিক আবহে সকলের সাথে কাজ করতেন। লুনার সাথে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিনটি ভুলতে পারে নি লুনা। সব মিলিয়ে ভালো লেগেছিল। জহির সাহেব বছরখানেকের মধ্যেই বদলি হয়ে যায়। আর কথা বার্তা হয় নি। ফেসবুকে নিউজফিডে দেখা যায়। যেহেতু সবার প্রতি আন্তরিক ছিল সেই ভরসাতেই বদলি সংংক্রান্ত বিষয়ে কাকে বলা যায়- ভাবনাতে জহির সাহেবের নাম লুনার মনে আসে । লুনা ইনবক্সে নক করে। সালাম ও কুশল বিনিময়ের পরে বদলির বিষয়টি তুলে লুনা। এ বিষয়ে হেল্প করবে, সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলে দেবে- জানায় জহির সাহেব। কিন্তু বদলি চায় কেন- এ প্রশ্নের উত্তরে এ কথা সে কথা অনেক কথাই বলে যায় লুনা। কথা বলতে বলতেই বুকের চাপা বাঁধ ভেঙ্গে যায় লুনার। সব ঘটনা খুলে বলে জহির সাহেবকে। বলে আর কাঁদে। জহির সাহেবও মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে সব শুনে। অনেক দিন পরে লুনা বুকে হালকা অনুভব করে। যে কথা কাউকে বলতে পারছিল না। সে কথাগুলো একজনকে বলতে পারলো। লুনা এটুকু বুঝতে পেরেছে – এই লোকের দ্বারা তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না। তাই মাঝে মাঝেই কথা হয়। এর মধ্যে বদলিটিও হয়ে যায়। জহির সাহেবের তদবির আর অন্য তদবির মিলে।
বদলি হয়ে গেলেও লুনা জহির সাহেবের সাথে কথা চালিয়ে যায়। সারাদিন অফিস রাতে বাসায় বাবা মার সাথে কথা বলা। আছে বন্ধু বান্ধব। তবু একজনের সাথেই তার কথা সব বলতে পারে। যার সাথে কথা বলে মন হালকা হয়। প্রতিটি মানুষেরই এরকম একজন লোক দরকার যাকে সব কথা বলা যায়। এমন কি গোপন কথাও। তাহলে মনের উপর চাপ কমে।
এসব ভাবতে ভাবতেই ট্যাক্সি এসে নদীর ধারে থামে। শহরের মাঝখানে নদী আর দুপাশে ভবন আর রেস্তুঁরার মেলা। প্রতিটি ভবন ও রেস্তুঁরার আলোকসজ্জা গিয়ে নদীর পানিতে বিচ্ছোরণ ঘটায়। নদীর পাশেই একটা রেস্তুঁরায় বসে দুজন।
বসে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এবং পরক্ষণেই দুজনে হেসে উঠে। কেন তাকালো, কেন হেসে ওঠলো- তার কোনো জবাব দুজনে জানে না। জহির সাহেব মুখ খুললো
কী খাবেন বলেন?
কিছু না।
কিছু না খেয়ে তো আর থাকা যাবে না।
দেন, কিছু একটা অর্ডার দেন। যা আপনার মনে চায়।
বিদেশের তিনটা জিনিসই আমার ভালো লাগে। জুস, সী ফিশ আর কফি। সী ফিশ আর কফি অর্ডার দিব?
লুনা মাথা নেড়ে সাই দিল।
ওয়েটারকে অর্ডার দিয়ে দিলো জহির সাহেব। আবারও দুজনে চুপচাপ। নদীর পানি দেখছে, পানির ভেতরে নগরীর আলোকসজ্জার খেলা দেখছে, আকাশে চাঁদও রয়েছে। চোখে মুখে বাতাস এসে লাগছে। একটা স্বর্গীয় অনুভূতি কাজ করছে। উভয়েই অনুভব করছে নিজেদের নিরবতার জগত।
লুনার মনে পড়ে যায়। বদলি হওয়ার পরও জহির সাহেবের সাথে তার কথা বন্ধ হয় না । বরং রুটিনে পরিণত হয়েছে। কথা না বলতে পারলে লুনা অস্থির হয়ে ওঠে। আর জহির সাহেবও নিয়মিত ফোন দেয়। কেবল ফোন দেয় তা নয়, সাথে এমন কিছু কথা বার্তা বলে যেগুলো রোমাঞ্চকর। হালকা টোনে বিভিন্ন বাক্য বলে বলে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। রাগও করা যায় না আবার হজমও করা যায় না। লুনার রাগ লাগে। আবার ভালোও লাগে। আকারে ইংগিতে জহির সাহেব নানান কথা বলতে চায়। যা বলতে চায় তা সত্য কিনা, তা সতিকার অর্থেই জহির সাহেবের মনের অনুভূতি কি না তা লুনা ঠাহর করতে পারে না। তবে ভালো লাগে কথা বলতে । তাই কথা বলে যায়। লুনা নিয়মিত ফোন দেয়। লুনা মিস করলে জহির সাহেব ফোন করে। এমন কোনো সপ্তাহ নেই যে আলাপ হয় না। সেই আলাপ দেশ, চাকুরি, কর্মস্থল, পুরাতন কর্মস্থল, রাজনীতি, কবিতা, দর্শন সব ওঠে আসে। সাথে ওঠে আসে নিজেদের আবেগ অনুরাগের মূর্ছনা। লুনা নির্ভর করতে চায়, আবার ভয় পায়। এক পা আগায় আবার আরেক পা পেছায়।
লুনা বুঝতে পারে যে, এখানে আগানোর কিছু নেই। কারণ জহির সাহেব তিন ছেলে এক মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সুখের সংসার করছে। সংসারের সব বিষয়ে তিনি পূর্ণ সুখী মানুষ বলেই সবসময় প্রকাশ করে থাকেন। সুতরাং সিরিয়াস কোনো বিষয় হয়তো নয়। তবু যখন জহির সাহেবের সাথে কথা বলেন তখন তার কেমন যেন হাঁসফাঁস লাগে। মনে হয় এক্ষুণি উড়ে চলে যাবে, আবার মনে হয় ভুলেও একাজ করা যাবে না। এরকম কথা বলতে বলতে দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। যে সম্পর্কের নাম দেওয়া যাবে না। পবিত্র সম্পর্ক বলা যেতে পারে। আবার ধর্ম ও সামাজিক রীতির ছাঁচে ফেললে অপবিত্র ও অনৈতিক সম্পর্কও বলা যেতে পারে। দূরে থেকে ফোনের আলাপের মধ্যেই যে সম্পর্ক নিহীত সে সম্পর্ককে কোনো নাম দেওয়া কঠিন। তবু তা চলতে থাকে।
ওয়েটার খাবার নিয়ে আসে। জহির সাহেবের সী ফিশ পছন্দ। খুব আয়েশ করে খাওয়া শুরু করে। কাটা চামচ দিয়ে খুঁটে খুঁটে ফিশ ফ্রাই খেয়ে যান। ফিশ ফ্রাই কাটা চামচে লাগিয়ে সসের মধ্যে একটু ডুবিয়ে মুখে চালান করে দেওয়ার পরে চোখ বন্ধু করে রাখে কিছুক্ষণ। অমৃত স্বাদটিকে প্রেমিকার চুমুর চেয়ে কম স্বাদের মনে হয় না জহির সাহেবের। লুনাও ফিশ ফ্রাই খেতে থাকে। শেষ হলে দুজনেই কফি খায়। কফি দুজনেরই পছন্দ। ব্ল্যাক কফি। লুনার ঘুম হয় না। ঘুমের ট্যাবলেট খায় প্রতিরাতে। তবু কফি ছাড়তে পারে না। কফিটা উপভোগ করে।
কফি খেতে খেতে লুনা হঠাত মুখ খুলে। জহির সাহেবের দিকে তাকিয়ে একটা লজ্জাবনত হাসি বিনিময় করে। পরে মুখ ফিরিয়ে নদীর দিকে তাকায়।
আমার খুব ইচ্ছা ছিল ছিল অনেক উচু থেকে নগরীর দৃশ্য দেখবো। চাঁদনী রাত হলে আরও ভালো।
আজতো চাঁদনী রাত। জহির সাহেব যোগ করে। চলেন তাহলে আজই যাই। ৮০ তলা ভবন রয়েছে যেখানে ছাদ রেস্তুরা রয়েছে। লুনা সম্মতির চোখে তাকায়। ডাগর চোখে। দুজনেই উঠে দাঁড়ায়। জহির সাহেব হাত বাড়ায় হ্যান্ড শেক করার ভঙ্গিতে। লুনা হাত বাড়ায় না। বলে আমাদের কি প্রথম দেখা হলো নাকি যে হ্যান্ডশেক করতে হবে! চলেন চলেন। দুজনে এগিয়ে যায়। ট্যাক্সি ডেকে ট্যাক্সিতে উঠে। জহির সাহেব গম্ভীরভাবে বসে আছে। হ্যান্ডশেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমানবোধটুকু তিনি লুকাতে পারছেন না। ড্রাইভারকে লোকেশন বলে আর নিজের গুগল ম্যাপও অন করে রাখে। মাত্র বিশমিনিটের পথ। লুনাও চুপচাপ বসে আছে। ভাবছে। হঠাত জহির সাহেব হ্যান্ডশেক করতে চাইলো কেন? তিনি কি আরও ঘনিষ্ঠ হতে চান? কতটা ঘনিষ্ট? শারীরিক সম্পর্ক? নাকি বিয়ে? বিয়ে কি তিনি করবেন? স্ত্রী ও চার সন্তানকে রেখে কি তিনি বিয়ে করতে রাজী হবেন? বিয়ে যদিও ইসলামসম্মত হবে তার স্ত্রী কি রাজী হবেন? তিনি কি এত বড় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? মনে হয় পারবেন না। না পারলে তবে কি কেবল শারীরিক সম্পর্ক চান? সেটাতো ধর্মীয়ভাবে সংগত হবে না। এরকম সম্পর্কে লুনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তবে কি লোকটি প্লেবয় টাইপের কেউ? যে সবার সাথেই শুতে পারে। তাহলেতো মুশকিল। লুনা ভাবনার কোনো আগামাথা পায় না। লোকটিকে লুনার খুব ভালো মানুষ মনে হয়। বড় মনের মানুষ। কথা ও কাজে মিল আছে। খুব সামাজিক ও দরদী। মানুষের বিপদে কাছে থাকে। আগলে রাখার চেষ্টা করে। অযথা ভাবসাব নেই। সবচেয়ে বড় বিষয় যে লোকটির অনুভূতি ক্ষমতা গভীর। মানুষের হার্দিক সমস্যা শোনা ও বোঝার মতো মনন ও মগজ আছে। নানা কথা ও আচরণে মানুষর হাজার অনুভূতির সুক্ষ্ম প্রকাশ তিনি করেনও। একারণেই লুনা লোকটিকে পছন্দ করে। বিশেষ করে শুনবার মতো ধৈর্য আছে। আছে অনুধাবন ক্ষমতাও। এতসব ভাবতে ভাবতে লুনা নিজেই লজ্জা পায়। লুনা কেন এত বেশি করে ভাবছে বিষয়টিকে। লুনা কি দুর্বল হয়ে পড়েছে। লুনা কি শারীরিকভাবে জেগে ওঠে জহির সাহেবের জন্য? যদি তাই না হবে তবে এত ভাবনা কেন আসে মনে! দুজন বিদেশে প্রশিক্ষণে এসেছে বিদেশে। কাকতালীয় দেখা হয়েছে। দুজন পরিচিত মানুষ এমনিতেই ভ্রমন করতে পারে। এর মধ্যে এত গভীরে ভাবার কিছু নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে লুনা আবারও লজ্জা পায় মনে মনে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে।
ট্যাক্সি থামে। যেখানে নামলো দেখা যাচ্ছে বিশাল বড় এক আবাসিক হোটেল। পাঁচতারকা হোটেল মনে হচ্ছে। লুনা ভেবে পাচ্ছে না এখানে নিয়ে আসলো কেন। তবে কি জহির সাহেব তাকে আবাসিক হোটেলে নিয়ে আসলো? কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই! রিসিপশনে গিয়ে জহির সাহেব যখন কথা বলছিল তখান লুনা মুখ ফসকে বলেই ফেললো ‘‘আমরা এখানে কেন? এই নিরিবিলি জায়গায় কেন? আমরা ছাদ রেস্তুরায় পাবলিক প্লেসে যাবার কথা‘‘
ছাদ রেস্তুরাতেই যাচ্ছি। ওয়েট অ্যান্ড সী। জহির উত্তর দেয়।
রিসিপশনিস্ট লিফ্ট দেখিয়ে দেয়। জহির সাহেব পা বাড়ায়। লুনা নিজেও সন্দেহ মন নিয়েই অনুসরণ করে। লিফ্টে উঠে যখন ৮০ বাটন চাপ দেয়, তখন লুনার কিছুটা সন্দেহ কমে। মুহুর্তেই ৮০ তলায় চলে আসে লিফ্ট। নেমে আরও এক তলা হেঁটে উঠে দেখে বিশাল এক রেস্তুঁরা। ছাদের চারপাশে ছোট ছোট টেবিল। জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে অনেক লোক। কোথাও কোথাও পারিবারিক বা বন্ধু বান্ধবদেরে আড্ডার মতো বড় টেবিল। লোকে লুকারণ্য পুরো রেস্তুঁরা। ছাদের এক পাশে কার্ণিশের একটি টেবিলে দুজনে বসে। নগরীর চারপাশ দেখা যাচ্ছে। আলোকোজ্জল নগরীর স্কাইভিউ দেখে মন চনমন হয়ে উঠে লুনার। অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল এরকম একটি জায়গায় আসার। এসে ভালো লাগলো। আকাশে চাঁদ। আর রেস্তুঁরায় বাজছে হালকা রিদমের ইংরেজি গান। সব মিলিয় পরিবেশটা দারুণ। রোমাঞ্চকর, আনন্দদায়ক এ পরিবেশ এমন যে চাইলে উদাসও হওয়া যায়, আবার লাফালাফিও করা যায়। নৃত্যও করা যাবে। জহির সাহেব ড্রিংকস করে না। লুনাও না। দুটি জুস নিলো। দুজনে টূংটাং কথা বলছে আর নগরীর ভিউ দেখছে। উপর থেকে রাস্তার গাড়িগুলোক জোনাকি পোকা মনে হয়। কিলবিল করে রাস্তা দিয়ে চলছে। দুজনের আলাপে পুরণো কর্মস্থলের কথাই ঘুরে ফিরে আসে। এর বাইরে কবিতার কথা, ধর্ম ও রাজনীতিও কিছুটা আসে। কথা খুব কমই হচ্ছে। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে একজন একটা কথা তুলে, অন্যজন উত্তর দেয়। এরকম নিরামিষ আলাপ।
তারপর আপনার সিংগেল জীবন কেমন যাচ্ছে? জানতে চায় জহির। লুনা কী জবাব দেবে তা নিয়ে ইতস্তত করে পরে মুখ খুলে। আমার জীবনতো এখন অনেক আরামের। অফিস করি, কাজ করি। ঘুরাঘুরি করি। বাসায় ইচছামতো রান্না করি, ঘুমাই, গান শুনি, মুভি দেখি। তথা মনে যা চায় তাই করি। স্বাধীন জীবন। আমার খুব বিন্দাস লাগে। চিল করি সবসময় যখনই সুযোগ পাই।
তবে চোখের নিচে কালি কেন? জহির সাহেব জানতে চায়।
ঘুম হয় না। হলেও খুব কম হয়। ডাক্তার দেখিয়েছি। ঘুমের অনেক ওষুধ দিয়েছে। কিন্তু তবু ঘুম হয় না। অনেক রাত তাকিয়ে থেকেই চলে যায়। নানান ডোজের ঘুমের ওষুধের নাম বলে যায় লুনা।
এরই মাঝে আরও দুটো আইসক্রিম অর্ডার দিয়ে দেয় জহির সাহেব। আইসক্রিম খেতে খেতে জহির সাহেব বুঝতে পারে যে লুনার ঘুমের ওষুধের ডোজের মাত্রা সাংঘাতিক। তাও ঘুম হয় না।
তার মানে আপনি ভালো নেই। স্বগতোক্তি করে জহির সাহেব। একটু আগে বলছিলেন খাও দাও ফুর্তি করে, মোজ মাস্তি করে বিন্দাস জীবন কাটাচ্ছেন। আসলে নির্ঘুম রাত আর চোখের নিচের কালি বলে দিচ্ছে যে আপনি ভালো নেই। আসলে একটার অভাব আরেকটা পূরণ করতে পারে না। একজন সঙ্গীর অভাব অন্য কিছু দিয়ে পুরণ হবার নয়। জীবনে সম্পদও লাগে, বিদ্যাও লাগে। স্বাধীনতাও লাগে, পরাধীনতাও লাগে। একা থাকাও লাগে, আবার প্রয়োজনের সময় সঙ্গীও লাগে। সারাক্ষণ সঙ্গীর ঠুকাঠুকি ও প্যানপ্যান যেমন ভালো লাগে না। তেমনি সারাক্ষণ একাও ভালো লাগে না। ভালো জীবনও লাগে মন্দ জীবনও লাগে। না হলে সবকিছু পানসে লাগে।
এসব কথা বলে জহির সাহেব কী বোঝাতে চায় তা বুঝতে পারে না লুনা। জহির সাহেব কি তবে জড়াতে চায় লুনার জীবনে? সেটার রকম কী হবে, মোডাস অপারেন্ডি কী হবে, বাস্তবে কীভাবে চলবে, ধর্মীয় ও সামাজিক বাধার কী উপায় হবে- এসব ভাবতে ভাবতে লুনা উদাস নয়নে নগরী দেখে। কী সুন্দর নগরী। এত আলোর নহর। এত মোহনীয় ও রঙ্গীন চোখ ধাধানো নগরীর ভবনগুলোতে কি সবাই সুখে আছে? নিশ্চয় অনেক ভবনে অনেক কান্নার নহরও রয়েছে। জাকজমকপূর্ণ নগরীর দু:খকষ্টগুলোও নিশ্চয়ই ওরকম জাকজমকপূর্ণই হয়। মানে এত গভীর ও বেদনাদায়ক যে তা ভেতরেই ঘটে। এই উজ্জ্বল ধাঁধাময় আলোকচ্ছটায় তা বোঝার উপায় নেই।
দেখতে দেখতে রাত ১১টা বেজে যায়। দুজনে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে নিজেদের হোটেলে চলে আসে। লুনা জানতে চায় আবার কখন দেখা হবে? আগামীকাল ক্লাসে। জহির জবাব দেয়।
এই দেখা না।
অন্য দেখা চাইলে আপনি আমার রুমে আসতে পারেন। বা আপনার রুমে আমি যেতে পারি!
লুনা মনে করিয়ে দেয়, দুজনের রুমেই আরও দুজন রুমমেট আছে। সুতরাং রুমে যাওয়া যাবে না। এসব কথা বলতে বলতে হাসতে হাসতেই দুজন বিদায় নেয়।
পরের দিন ক্লাসে আবার দেখা হয়। চোখে চোখে কিছু কথা হয় বটে, তবে সেসব কথার কী অর্থ দাঁড়ায় তা জহির বা লুনা কেউই ঠিক করতে পারে না। তার পরের দিন দুজনের গ্রুপ দুই শহরে চলে যায়। এক্সপোজার ট্যুরের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে বেড়ানো হয়। তিনদিন পরে যখন তারা আবার ফিরে আসে তখন তাদের ক্লাসরুম ও হোটেল ভ্যানু ভিন্ন হয়ে যায়। সুতরাং দেখা হওয়ার সুযোগ আর নেই।
জহির সারাদিন ক্লাস শেষ করে শপিং এ গেলো। গিয়ে সেখানে পারফিউম দামদর করতেছিল। সেখানেই হঠাত করে লুনা হাজির। দুজন দুজনকে দেখে নিজেরাই অবাক বনে গেছে। কাকতালীয়ভাবে কী করে এখানে আবার দেখা হলো। এর মধ্যে প্রকৃতির কোনো লীলা আছে কিনা এ প্রশ্নও তুলে জহির। বলে ‘‘নিশ্চয়ই তোমার সাথে আমার কোনো কানেকশন আছে, না হলে এরকম কাকতালীয়ভাবে দেখা হবে কেন?‘‘
লুনা হেসে উড়িয়ে দেয়। আরে না। পৃথিবী গোল, আর কাজ, কেনাকাটা ও অফিসিয়াল ধরণ এক বলে হয়তো দেখা হয়ে যাচ্ছে। এর সাইন্টেফিক ব্যখ্যা আছে। জহির লুনার বৈজ্ঞানিক সিরিয়াস উত্তর শুনে আর কথা বাড়ায় না। জহির সাহিত্যমনা মানুষ। তার জগত ভিন্ন অনুষঙ্গ দিয়ে গড়া। সুতরাং লুনা হয়তো তাকে বুঝবে না। জহির লুনাকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানায়। সামনেই একটি থাই রেস্তুঁরা দেখা যাচ্ছে। লুনা এখনো ডিনারের টাইম হয় নি বলে হালকা এড়ানোর ভান করে। কিন্তু এমনভাবে তাকায় যে, ডিনারের প্রস্তাবটাই সে চাচ্ছিল। কিন্তু লুনা তা প্রকাশ করতে রাজি না। লুনার ভেতর যত ঝড়ই বইয়ে যাক, লুনা নিজেকে সংবরণ করে রাখে। প্রকাশ করে না। বরং খটমট আচরণ করে, মাঝে মাঝে পাত্তা না দেওয়া ও এড়িয়ে যাওয়ার মতো কঠিন আচরণ করে। সে কারণে জহির প্রায়ই মনক্ষুন্ন হয়। অন্যদিকে জহির সামাজিক ও দায়িত্বশীল ভালো মানুষ হিসেবে খুবই আন্তরিক প্রকাশ করে। নিজেকে মেলে ধরে। ঠাট্টা, হাসি ও রোমান্টিকতার বিষয়গুলো স্বতস্ফুর্তভাবে প্রকাশ করে। সে কারণে লুনার ভেতরে নানান ধরণের কল্পনার ফানুস উড়ে। জহিরকে নিয়ে নানান গভীর ভাবনা ভেবে অতলে হারায়।
যাই হোক, দুজনে ডিনারের জন্য থাই রেস্তুরাতে ঢুকলো। রেঁস্তুরার নাম কুব কাও কুব প্লা। কিছু রেসিপি অর্ডার করলো। ক্রিসপি লাইমলিফ হানি যোগে কোরাল, নারকেলমিল্পক ও শাকযোগে স্যুপ, রাইস, চিংড়ি ফ্রাই। খাবার আসতে আসতে দুজনের মধ্যে আবার কথা শুরু হয়। লুনা হঠাত করেই প্রশ্ন করে-
‘‘আপনি আমার কাছে কী চান?‘‘
এ প্রশ্নের ধরণে ও লুনার চাহনির ধরণে জহির চুপসে যায়। কী বলবে ভেবে না পেয়ে, কিছুটা অভিমানে চুপ করে তাকিয়ে থাকে। পরে মুখ খুলে।
‘‘তোমার কাছে আমার চাওয়ার কী আছে? এটা কেমন ধরণের প্রশ্ন! তোমার কাছে আমি কিছুই চাই না। তোমার কাছে আমার চাওয়ার কিছুই নেই। কিছু পাবো তেমনটা আশা করি না। বরং তোমাকে আমি দিতে চাই। তুমি নিতে পারবা কি না সেটা বলো। না নিতে পারলে সেটা তোমার সমস্যা। সে প্রসঙ্গ তোলা থাক। আমাকে এরকম প্রশ্ন করার কোনো মানে নেই। আমি তোমার কাছে কিছুই চাই না। কিচ্ছু না।‘‘
বলার ধরণে কিছুটা অভিমান ও রাগ প্রকাশ পায়। লুনা তা বুঝতে পেরে হাসি দিয়ে পুরো পরিস্থিতিটাকে উড়িয়ে দিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই চেষ্টা বৃথা যায়। মাঝে মাঝে এমন হয়, বুকের ভেতর এমন সব বাজনা বাজে, মনোজগতে এতসব খেলা খেলে যে তা বলাও যায় না, সওয়াও যায় না। তখন হাসি দিয়েই আমরা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা আনার চেষ্টা করি বটে। তবে স্বাভাবিক হয় না। বরং অপ্রস্তুত ও বিব্রতবোধ চেহারায় এমনভাবে ফুটে উঠে যে তা আরও হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এরই মধ্যে খাবার চলে আসে। জহির ক্রিসপি লাইমলিফ হানি যোগে কোরাল মুখে তুলে নিয়ে খেতে শুরু করে। মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে এমনভাবে খাচ্ছে যেন বেহেশতি খানা। মাঝে মাঝে নারকেলমিল্কযোগে শাকের স্যুপটাও খেতে থাকে। আর ইয়াম্মি ইয়াম্মি বলে আওয়াজ করে। লুনার এসব খাবার ভালো লাগে না। বিদেশী খাবার সে খেতে পারে না। সামান্য একটু মুখে দিয়ে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করে। বাংলাদেশী মশলা ও রান্নার ধরণ না হলে লুনা খেতে পারে না। সবকিছুতে বমি বমি ভাব আসে।
বমির কথা বলাতে জহির ঠা্ট্রা করে বলে ‘‘ বাচ্চা কবে হবে? আবার কার থেকে বাচ্চা নিলে?‘‘ শুনে কপট রাগ করে লুনা বড় চোখ করে তাকায়। দুজনেই হেসে হেসে খাবার উপভোগ করে। এভাবেই ঘন্টা দুয়েক কাটিয়ে ঘুরাঘুরি করে উইন্ডো শপিং করে। কেনার চেয়ে কথাই যেন বেশি উপভোগ্য। ঝগড়া, খুনসুটি, খোঁচাখুচি করে সময় কেটে যায়। হয়ে যায় রাত। তারপর দুজন বিদায় নেয়। তারপর আর তাদের সিংগাপুরে দেখা হয় না।
দেশে ফিরে আসে। নিজেদের অফিস ও কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়।
বেশ কয়েকমাস পরে কিংবা বছরখানিক পরে একদিন লুনা ইনবক্সে নক করে।
আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন??
:আমাদের আর খবর! কে নেয় অধমের খবর?
: এইতো খবর নিলাম।
: এতদিন পরে! এতদিন খবর না নিলে ভালো থাকি কী করে?
: এই প্রশ্নতো আমিও করতে পারি। আমার খবরওতো আপনি নেন না।
: আমিতো নক করি নি কারণ তুমি প্রশ্ন করবে ‘‘ আমি কি চাই‘‘। তাই নক করি না
: শুধু কথাটাই মনে রাখলেন। আর মনোভাবটুকু বোঝার চেষ্টা করলেননা।
: মানুষতো কেবল প্রকাশটুকুই বুঝে। মানুষতো আর অন্তর্যামী না যে ভেতরের খবরও জানবে।
লুনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইনবক্সে আবার লিখে।
আজ আমি সিরিয়াসলি একটি বিষয় বলার জন্য নক করেছি।
ঠিক আছে বলো। জহির সায় দেয়।
; আমি আপনাকে কিছু একটা বলবো। আপনার কাছে কিছু একটা চাইবো। আপনি না করতে পারবেন না। রাজী?
: কী? টাকা পয়সা?
: আরে না। আমাদের সম্পর্কের বিষয়। আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি। আমি এখন যা বলবো তা আপনি রাখতে হবে। না করতে পারবেন না।
: আগে বলো শুনি।
: না, আগে কথা দেন। যে আপনি ফিরিয়ে দেবেন না।
জহির চিন্তায় পড়ে যায়। কী না কী চায়। কী হয়েছে কে জানে। কতটা গভীরে গেছে কে জানে। জহির বুঝতে পারে যে আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। সম্পর্কের ডালপালা এখানেই কাট করা উচিত। সমাজ, ধর্ম, পরিবারের নানান বিষয় থাকে। সব ছাপিয়ে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। তাই নিজেদের লাগাম টানাই ভালো। জহির আর কোনো রিপ্লাই দেয় না। ইনবক্সে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। পরে মিউট করে দেয়।
লুনাও কয়েকবার হ্যালো, কী বিষয়? রিপ্লাই দিচ্ছেন না কেন? ইত্যাকার প্রশ্ন করে। কতক্ষণ পরে থেমে যায়।
যোগাযোগের সকল মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়। ফোন, দেখা সাক্ষাত, সোশ্যাল মিডিয়া।
সব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও লুনা ও জহিরের মনোজগতে একে অপরের বিষয় খেলা করা কি না তা হয়তো প্রকৃতি জানে। প্রতিবেশীরা জানে না। জানে না তাদের নিকটাত্মীয় ও স্বজনরাও। কিছু বিষয় এমনি গোপনে ঘটে, গোপনে থাকে। কোথাও দেখা যায় না, শোনা যায় না। তবু সমস্ত জুড়ে থাকে। কিংবা থাকে না। কেবলি আকাশের বাস্পরূপে এই আছি এই নাই ধরণে আসে আবার হারিয়ে যায়।
