Detail

Home - গল্প - গল্প: ‘ একটি জামা চাই’ – সফিকুল ইসলাম

গল্প: ‘ একটি জামা চাই’ – সফিকুল ইসলাম

জমিলা বেগম তার নাতনি জিমিকে নিয়ে সকাল ৮টা থেকেই দোকানের সামনে বসে আছে। তখনও দোকান খুলে নি। তাই দাদি নাতনি মিলে রোদ পোহাচ্ছে। নাতনিকে বলছে পিঠ চুলকে দিতে। নাতনিও খুব খুশি মনে দাদির পিঠ চুলকে দিচ্ছে। যেখানে চুলকানো দরকার সেখানেই ঠিকমতো চুলকাচ্ছে। দাদি আরাম করে চোখ বন্ধ করে চুলকানোর আরামটা উপভোগ করছে। সাধারণত জিমিকে ডাকলে জমিলার ডাক তেমন একটা শুনে না। আর চুলকাতে বললেও চুলকায় না। কিন্তু আজ জমিলা যা বলছে তাই শুনছে জিমি। কারণ আজ দাদি জিমিকে এখানে মার্কেট এলাকায় নিয়ে এসেছে, এতেই খুশি জিমি। অন্য আরও তিনটি নাতি নাতনি আছে জমিলার। তাদের না এনে জিমিকে নিয়ে এসেছে, এতে করে জিমি যেন আনন্দে আকাশে ওড়ছে।

জমিলার বয়স সত্তোরর্ধ্ব আর নাতনির বয়স মাত্র ৭। বাঁধের ওপারে বস্তিতে থাকে এরা। চার কিলোমিটার হেঁটে এতদূর এসেছে বড় স্বপ্ন ও ভাবনা নিয়ে। আমাদের হয়তো মনে হতে পারে, এটা কী এমন বড় স্বপ্ন, কিন্তু তাদের কাছে এটাই বড় স্বপ্ন। জমিলা কখনও ভিক্ষা করে নি। তাই এসব পথ তার জানা নেই। কিন্তু গত কয়েকদিন যাবত বস্তির অন্য কয়টি খুপড়ি ঘরে দেখতে পেয়েছে বাচ্চাদের নতুন জামা আর সন্ধ্যার সময় মজার মজার ইফতারি। জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছে যে বড় মার্কেট এলাকায় গিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে বড়লোকেরা যখন জামা কিনে তখন অনুনয় করে বললে তারা বাচ্চাদের জামা দেয়, বা বড়দেরকে জাকাতের কাপড় তাদক্ষণিক দিয়ে দেয়। আর ইফতারি কেনার সময় বড়লোকদের বললে তারা সামান্য ইফতারও কিনে দেয়। এরকম সারাদিন থাকতে পারলে অনেক পরিমাণ ইফতার ও জামা কাপড় নিয়ে ফিরে আসা যায়। এসব বেশ কয়েকদিন যাবতই শুনছিল। তাছাড়া নিজের নাতি নাতনিদের প্রতিদিনে কান্নাকাটি বায়না ধরা দেখতে দেখতে জমিলা  আজ ঠিক করেছে একজনকে নিয়ে এ মার্কেট এলাকাতে আসবে। তাই আসা।

 

এসে দেখে মার্কেট এখনও খুলে নি। দুয়েকটি দোকানের শাটার খোলার লোক এসেছে। ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করছে। প্রত্যেক দোকানদার ও বিক্রয়কর্মীরা দোকান ঝাঁড়ু দিয়ে পানি ছিটিয়ে, আগরবাতি ধরিয়ে, দোয়া পড়ে দোকানের পশরা রেডি করছে। ওরা প্রথম যেখানে বসেছিল সেখান থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। কারণ ফুটপাতের এখানেও কাপড়ের দোকান, ডাবওয়ালা,  ইফতারিওয়ালা, জিলাপিওয়ালা দখল নিয়ে বসে যাচ্ছে। বেলা বাড়তে বাড়তে তিল ঠাঁই আর জায়গা নেই। সব দোকান খুলে গেছে, সামনের সারিতে দোকানের সামনে ফুটপাতের দুপাশেও দোকান বসে গেছে। বড় বড় বস্তা, বক্স, ছোট টেবিল এনে কাপড়চোপড় নিয়ে বসে। মনে হয় প্রতিটিই দোকান। এরপরে রাস্তার পার্কিং অংশও দখল করে বসে গেছে আরেকদল। দেখতে দেখতে পুরো এলাকা যেন কেবল বিক্রয় পশরা। মানুষ হাঁটবে, ক্রেতারা আসবে এমন স্থানও খুব একটা রাখা হয় নি।

জমিলা বেগম শুরুতে ভেবেছিল খুব আরামই হবে। দোকান খুললে দোকানে কাস্টমার আসলে দোকানে ঢুকবে। বাকি সময় বসে থাকবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাদের দাঁড়ানোর কোনো জায়গাই নেই। দোকানে ঢোকার চেষ্টা করলেই দোকানদার গালাগালি করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। ফুটপাতে দাঁড়ালে ফুটপাতের দোকানদার সরে যেতে বলে। রাস্তায় দাঁড়ালে ক্রেতাদের দল লাইন ধরে হাঁটছে তারাও বিরক্ত হয় হাত ইশারায় সরতে বলে।

এত বড় মার্কেট এলাকা! সবার জায়গা আছে। সবাই বসতে পারে, হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে, বেচাকেনা করতে পারে। কেবল তাদের জন্য একতিল জায়গা নেই যেখানে দাঁড়াবে!

বস্তিতে গত কয়দিন ধরে অন্যদের হাতে কাপড় ও ইফতারি দেখে জমিলা মনে মনে অনেক স্বপ্ন দেখেছে। ভেবেছে যে সেও নিজের জন্য এরকম কাপড় ও ইফতারি সংগ্রহ করবে। নাতি নাতনিদের হাতে কাপড় ও ইফতার তুলে দিয়ে গর্ব ও আনন্দ উপভোগ করবে। কল্পনায় ও স্বপ্নে তার যত কিছু  আছে সে চিন্তা করেছে। কিন্তু এখন দেখছে যে এটা কোনো সহজ কর্ম নয়।

এরই মাঝে কোনো একটি দোকানের সামনে কোণায় জবুথবু হয়ে দাঁড়ায়। নাতনি জিমিকে সামনে রেখে। দোকানটিতে বাচ্চাদের কাপড় সাজানো। জিমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে প্রতিটি কাপড়। একেকটি জামার দিকে তাকায়। জিমি মনে মনে কাপড়টি পরে। কল্পনায় সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সে দেখতে পায় তাকে ঠিক পরীর মতো লাগছে। তবে রঙটা লাল হলে ভালো হতো। আবার সে কাপড় খুলে, মনে মনেই আরেক সেট কাপড় দোকান থেকে নেয়, সেটিও পরে। পরে দেখে কেমন লাগে। এভাবে দাদি জমিলার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সে মোটামুটি দোকানের সবগুলো কাপড়ই পরে ফেলে। এবং প্রতিবারই আয়নায় দাঁড়ায়, মনে মনে নিজের ছবি দেখতে পায়। আর কল্পনায় তার তিন ভাইবোন ও সহপাঠিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওদের চোখে অবাক হওয়া ও হিংসা দেখে ওর ভালো লাগে।

দাদি জমিলার ধাক্কায় জিমির খোয়াব কাটে। জমিলা জিমিকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এক ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ভদ্রলোকটি নিজের মেয়ের জন্য ৫ সেট জামা কিনেছে। প্রতিটিই অবাক করা সুন্দর। জমিলার মনে হয়েছে যে বিরাট বড়লোক হবে। তার কাছে গিয়ে চাইলে নিশ্চয়ই না করবে না। জিমিকে নিয়ে গিয়ে ভদ্রলোকটির কাছে অনুনয় করে তাকায়। জিমিকে দেখিয়ে বলে,

বাবা, আমার নাতনিটাকে একটা জামা কিনে দেন না? ওর কোনো কাপড় নেই। সামনে ইদ।

ভদ্রলোক খুব ব্যস্ত এগুলো শোনার মতো সময় নেই। দ্রুত বিল দিয়ে চলে যেতে যেতে হাতে থাকা খুচরা বিশ টাকা জমিলার হাতে ধরিয়ে দেয়। জমিলা খুব আশাহত হয়। এত বড় লোক!  এতগুলো জামা কিনলো। আর তার নাতনিকে একটা ফ্রক দিতে বললো তাও দিলো না। মাত্র বিশ টাকা! একটু অপমান লাগলো জমিলার। গরীবরদের এত মান অপমান থাকতে নেই। সেটা জিমিকে বুঝতে না দিয়ে আবারও দোকানের কোণে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। জিমিকে বুঝতে না দিলেও জমিলার মনের ভিতর দিয়ে ঝড় চলতে থাকে। গরীবদের মান অপমান থাকতে হয় না- এটা সবাই বললেও বাস্তবতা হলো গরীবরদেরই মান অপমান বোধ টনটনে। এটাই তাদের একমাত্র সম্বল। বরং বড়লোকদের মান অপমান বোধ থাকে না। তারা কোথা থেকে আয় করে, কোথায় ব্যয় করে, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এসব বাছবিচার করে না। রাগে ক্ষোভে জমিলার কান্না এলেও সেটাকে থামায়। কান্নার দলা ঢোক গিলে আবারও তাকিয়ে থাকে। যদি কেউ আসে, বড় লোক কেউ। তার কাছ থেকে কাপড় চাইবে।

এরই মধ্যে দেখে যে এক মহিলা দুই হাত ভর্তি অন্তত ৩০ সেট কাপড় সে কিনেছে। তাকে দেখে দৌড়ে যায় জমিলা। সাথে জিমিও। জমিলা জিমিকে দেখিয়ে মহিলাকে বলে

আফা, আমার নাতনিটা ছোট মানুষ। ওর জামা কেনার সামর্থ্য নেই। সামনে ইদ। আপনি ওর জন্য একটা কাপড় কিনে দিন। ভদ্রমহিলা তাকাচ্ছে না জমিলার দিকে। জমিলা বারবার করে বলে যাচ্ছে। জিমিও ভদ্রমহিলার কাপড় ধরে বারবার করে বলছে।

আমাকে একটা কাপড় দেন না! আমাকে একটা কাপড় দেন না!

ভদ্রমহিলা দুজনকে কড়া ধমক দিলো।

‘‘এই ছাড়ো ছাড়ো। কাজ কর্ম নেই, খালি কাপড় কাপড়। বাসায় বাসায় গিয়ে কাজ করো। কাজ করলে টাকা পাবা। টাকা পেয়ে তারপর কাপড় কিনতে এসো, যাও।

জমিলা কিছু ঘাবড়ে যায়। তবু বলা থামায় না। ‘‘আপনাদের তো অনেক কাপড়। একটা কাপড় কিনে দিলে কী হয়। দেন না! ‘‘

ভদ্রমহিলা না শোনার ভান করে, বেরিয়ে যেতে যেতে জিমির হাতে দশ টাকার একটি নোট দিয়ে চলে যায়।

জমিলা ও জিমি খুব হতাশ হয়। তবে দুজন দুজনের দিকে আর তাকায় না। তারা ভদ্রমহিলার নাকচ করাটা হজম করতে পারলেও নিজেদের মধ্যে নিজেদের চোখে থাকা ব্যর্থতাটা হজম করতে পারবে না। জিমি নিচের দিকে তাকিয়ে দাদির কাপড় ধরে আছে। আর জমিলা দূরে কোথাও আকাশের দিকে তাকিয়ে।

একটু পরে আবার স্থিতু হয়ে আবার খেয়াল রাখে জমিলা। কার কাছে চাওয়া যায়। কে আছে এমন যে তার নাতনিকে এক সেট জামা কিনে দেবে।

একটা লোক দোকানে ক্রেতা হিসেবে ঘুরছে অনেকক্ষণ। কাপড় চোপর দেখছে, দামদর করছে। কিছু কিনছে না। তার কাছে জমিলা যায় না। ভাবে, সে গরীব, কিপটা। খালি দাম করে, কেনে না। সে কখনও আমাদের কাপড় দেবে না। ভেবে তার কাছে আর যায় না। বরং একটু তাচ্ছিল্য আর করুণা করেই তাকায় লোকটির দিকে। এ জগতে ছিমছাম, হিসেবি, কম টাকার লোকদেরকে কেউ গোণে না। সুতরাং জমিলা ও জিমি গুণবে না তাই স্বাভাবিক। জিমি ও জমিলার চোখ বড় লোক খুঁজতে থাকে। যাদের অনেক টাকা, অঢেল টাকা। অঢেল টাকা হতে হলে, কালো টাকাই হয় বেশি, সেটা জমিলার মাথায় কাজ করার কথা না। জিমি তো দুনিয়ার কিছু জানেই না। সুতরাং দুজনেই সহজ হিসেবে বড়লোক পয়সাওয়ালা লোক খোঁজ করায় মন দেয় ।

জমিলা রোজা রেখেছে। চার কিলোমিটার হেঁটে এসে তার শরীরে আর শক্তি নেই। আর জিমি রোজা রাখে নি। তবে এখনও কিছু খায় নি। বেলা বাড়তে বাড়তে দুপুর একটা বেজে গেছে। জিমির মুখটা শুকিয়ে একদম শুষ্ক হয়ে গিয়েছে। মায়ায় তাকানো যাচ্ছে না। তবু কাপড় পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর দুটো বড় বড় চোখ অবাক করা সুন্দর করে তাকিয়ে দেখছে।

এবার আর তত বড় কাউকে ধরে নি। একজন ভদ্রলোক দেখে মনে হচ্ছে খুবই নরম স্বভাবের হবেন। জমিলা ভাবলেন তাকে ধরবেন। লোকটি একটি জামা কিনলেন। কিনে চলে যেতে উদ্যত হলেন। এমন সময় জমিলা জিমিকে নিয়ে গিয়ে আবার সামনে।

লোকটি না শোনার ভাণ করে আগাতে লাগলো। এবার জিমি লোকটির পা ধরে ফেলেছে। আঙ্কেল আঙ্কেল আমাদেরকে একটা কাপড় কিনে দেন। লোকটি ছাড় ছাড়! বলে চিৎকার করতে করতে সরাতে চেষ্টা করছেন। দোকানির সহকারি এসেও তাদের ধমকাতে লাগলেন।  আর দোকান থেকে বের করে দিলেন। ধমক ও জোরজবরদস্তিতে জমিলা ও জিমি কিছুটা বিধ্বস্ত অবস্থা।

ভদ্রলোকটি ভিতরেই আছে। লোকটি অন্য কাপড় খোঁজ করতে করতে মনে মনে ভাবছে, আমিতো গত সপ্তাহেও অনেক কাপড় কিনলাম। এ সপ্তাহেও কিনেছি। আজ দরকার নেই তবু দেখতে এলাম কী কেনা যায়। পরিবারের কেউ তো বাদ নেই, যে কাপড় দিই নি। বরং একেকজনকে কয়েক সেট করে কাপড় দিয়েছি। কারও মধ্যেই কোনো কৃতজ্ঞতাবোধ দেখি নি। সবাই আরও আরও চাই অবস্থা। কারও রঙ পছন্দ হয় না। কারও রঙ পছন্দ হলে ডিজাইন পছন্দ হয় না। কাপড় পেলে জুতায় হয় না। জুতা হলে অন্য জামায় হয় না। মানে অভিযোগ ও অসন্তুষ্টি সবার চোখে মুখে দেখেই যাচ্ছে। প্রতিদিনই  একবার করে ইদের শপিং এ আসে। চেষ্টা করে সবার মন রক্ষা করতে। কিন্তিু কোনো কূল কিনারা হয় না। তবু ভদ্রলোকের জমিলা ও জিমির বিষয়ে কোনো রিয়েলাইজেশন হয় না। তাদের কিছু দেবার কথা মনে আসে না। জিমির মুখটিতে হাসি ফোটানোর কথা মাথায় আসে না। ভদ্রলোকটি এত ভদ্র যে ভদ্রপল্লীর সকল এটিকেট ম্যানার জানলেও মানুষ ও সৃষ্টি নিয়ে তার কোনো বোধ তৈরি হয় না। ধর্মে একটু বিশ্বাস করে। তাই হঠাৎ মনে হলো আরে! জাকাতের টাকা তো আছে। জাকাত তো কম বেশি দেওয়া লাগবেই। না দিলে আবার মান সম্মান থাকবে না। লোকজন আড়ালে আবডালে টিপ্পনি কাটবে।  তাই জাকাতের টাকা দিয়ে শাড়ি ও লুঙ্গি কিনে বড় অনুষ্ঠান করে ছবি তুলে তুলে প্রদান করে। ঢাকাতে ও গ্রামের বাড়িতে। জমিলার দিকে তাকিয়ে লোকটি দোকানিকে বলে একটি জাকাতের লুঙ্গি ও একটি জাকাতের শাড়ি দেন। দোকানি দেয়। দোকানিকে ৪০০ টাকা দিয়ে, শাড়ি ও লুঙ্গিটি নিয়ে দোকান থেকে বের হয়। বের হয়ে জমিলার হাতে দুটি ধরিয়ে দেয়। এ দেওয়ার মধ্যে ভদ্রলোকটির অনুকম্পা, দয়া, দাতা হওয়ার গর্ব সব টের পাওয়া গেছে। জমিলাও হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জিমি খুশি হয় নি। কারণ এখানে জিমির কাপড় নেই। আর জমিলাও খুশি নয়। সে নিজের জন্য আসে নি। তার নিজের জাকাতের শাড়ি দরকার নেই। কাপড় যা আছে তাতেই চলবে। নাতি নাতনির জন্যই সে এসছে। তবু দুটি কাপড় হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। এগুলো হাতে নিয়েই আরও দু চারজনকে বলার চেষ্টা করলো। কয়েকজন উল্টো ধমক দিলো। এক তরুণী দুহাত ভর্তি শপিং ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জমিলাকে বললো,

‘‘শাড়ি পেয়েছো, লুঙ্গি পেয়েছো, তবু পেট ভরে না? আর কত চাও হ্যাঁ?‘‘

এক বয়স্ক মুরব্বী ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে জিমির দিকে তাকিয়ে বললো,

‘‘নিজেরটা পেয়েছো, এখন আবার নাতনি নিয়ে এসছো, তোমাদের বাবু খাই খাই স্বভাবটা গেলো না!‘‘

 

জমিলা আগে কখনও ভিক্ষা করে নি। কীভাবে বড়লোকদের মন নরম করতে হয়, সে জানে না। কীভাবে বললে কী করলে তারা সহজেই দিয়ে দেবে তাও বুঝতে পারছে না। নাতি নাতনিগুলো সারাদিন ইদের কাপড় নিয়ে ওদের বাবা-মার সাথে কান্নাকাটি করে দেখে, আজকে আসা। জিমির বাবা লেবারের কাজ করে, আর মা বাসাবাড়িতে কাজ করে। তাতে ওদের পুরো মাসের খাবার খরচ ও থাকা খরচ মেটাতেই চলে যায়। জমিলার জন্য ‍ওষুধ কেনার টাকাও ঠিক মতো পায় না। সেখানে ইদের জামা কেনার মতো শখ আহলাদ মেটানোর কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না।

জমিলা ও জিমিকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দোকানি ও ম্যানেজার বিরক্ত হয়ে গেলো। এরই মধ্যে দুচারজন ক্রেতার বিরক্ত হওয়া দেখে দোকানি রেগেই গেলো। কিছুক্ষণ বকাবাজি করে জমিলাকে চলে যেতে বললো। দোকানমালিকের গরীব ফকির নিয়ে ভাবলে চলে না। তাকে ব্যবসা দেখতে হয়। ব্যবসা থেকে লাভ হলে পরে সহকারিদের বেতন দেওয়া হয়। দোকানের সব খরচা দেওয়ার পরে লাভ। সুতরাং বিক্রি কমে গেলে লাভ হবে না।

সারা বছরের মধ্যে কেবল ইদেই একটু বেচাকেনা।  এ সময়টা নষ্ট করার মতো সময় নেই। কাস্টমার হলো লক্ষী। কাস্টমার ফিরে যাক বা বিরক্ত হোক, তা দোকানি চিন্তাও করতে পারে না। এমনিতেই দোকানে অনেক লগ্নি। বিনিয়োগকৃত টাকার সুদ পরিশোধ করার পরে লাভ ঘরে নেওয়া কঠিন। বাচ্চাগুলোর পড়াশোনা আগাচ্ছে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াবে। প্রচুর টাকা দরকার। গৃহিণীকে প্রতি বছরই ইদে গহণা দিতে হয়। বাচ্চাদেরও বায়নার শেষ নেই। চারদিকে এত চাপ। এতসব চাপে জমিলা ও জমিলার নাতনির এ দিকদারি ও বিটলামি ভালো লাগছে না। জমিলা ও জিমির জন্য যা অসহায়ত্ত্ব, সেটাই দোকানদারের জন্য ব্যবসায় ক্ষতির কারণ। তাই সবাই মিলে জমিলা ও জিমিকে ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানোর জায়গা আসলে নেই। ধাক্কাধাক্কির মধ্যেই দোকানের বাইরে এক কোণে দাঁড়ানো। ফুটপাতেও হাজার হাজার লোক। তিল পরিমান জায়গা নেই। হঠাৎ দেখলো একজন লোক দোকান থেকে ইশারা দিচ্ছে।

প্রথমে জমিলা বুঝতে পারে না, তাকেই নাকি অন্য কাউকে। পরে দেখে যে তার দিকেই তাকিয়ে দোকানের ভিতরে ডাকছে। সেই লোকটি যে দোকানে কেবল দামদর করে, কিছুই কেনে না। অনেকক্ষণ ধরে এ দোকানের এ পাশ থেকে ওপাশে ঘুরছিল।

লোকটি জিমিকে কাছে ডেকে বলে, মা, তুমি কোন জামাটি নিবে পছন্দ করো। আমি কিনে দেবো। জিমি লাল সাদা ফ্রকটি পছন্দ করে। সেটা তার সাইজের দেখে লোকটি তার হাতে ধরিয়ে দেয়। লোকটি জিজ্ঞেস করে, তোমার আর জামা লাগবে?

জিমি বলে, আমার লাগবে না। আমার দুই ভাই আছে, আর বড় বোন আছে। ওদের লাগবে। লোকটি মনে মনে অবাক হয়। ভাবে, একটি ফ্রক পেয়েই মেয়েটি বলছে, তার আর কিছু লাগবে না। অন্য জামা নয়, প্যান্ট নয়, জুতা নয়, মাথার ক্লিপ নয়, কিচ্ছু নয়। দ্বিতীয় যেটা প্রথমে তার মাথায় এসেছে তার বোনের জামা লাগবে। লোকটি খুশি হয়, কিছুটা অবাকও হয়। অশ্রু চোখের কোণে ঝিলিক মারে। দোকানদারকে বলে ওকে তিনটি জামা দিতে। বয়স জেনে নেয় জমিলার কাছ থেকে। তিনজনের জামা দেওয়ার পরে লোকটি জমিলাকে প্রশ্ন করে, আপনার জন্য কিছু নেন। জমিলা বলে, না না আমি বুড়ো মানুষ। আমার কাপড় দিয়া কী কাজ? এক ঠ্যাঙ কবরে গিয়ে আছে, দুদিন পরে মরে যাবো। তবে আপনি যদি দিতে চান, আমার বউমা তথা জিমির মাকে একটি শাড়ি দিতে পারেন। আর আমার ছেলেকে একটি পাঞ্জাবি।

লোকটি জমিলার দিকে তাকায়। মনে হয় স্বর্গ থেকে কোনো মহিয়সী তার সামনে দাঁড়ানো। যে বুড়ো বয়সে তার সন্তান, সন্তানের বউ ও নাতি নাতনিদের কথা ভাবছেন। হোক ভিক্ষা করে, হোক অনুরোধ করে। তাদের সুখী মুখ দেখেই যে জমিলার মুখে হাসি তা বোঝা যাচ্ছে।

অনেকক্ষন ধরে লোকটি জমিলা  ও জিমিকে খেয়াল করছিল। এতক্ষণ এদের মুখে উৎকন্ঠা, উদ্বিগ্নতার ছাপ দেখা যাচ্ছিল। মানুষের বারংবার নাকচ করা, ফিরিয়ে দেওয়া ও অপমানজনক কথায় তাদের চেহারা কালো আর মলিন দেখা যাচ্ছিল। এখন জামাগুলো পাওয়ার পরে দুজনের মুখেই যেন খুশির ঝিলিক উপচে পড়ছে। লোকটি ভাবে বেহেশততো এখানেই দেখা যাচ্ছে। জমিলার ছেলের বউয়ের জন্য শাড়ি ও ছেলের জন্য পাঞ্জাবি অর্ডার করে। সব টাকা পরিশোধ করে।

জমিলা অবাক হয়। এতক্ষণ ধরে লোকটি নানান জামার দাম করছিল। কিনছিল না। জমিলা ভেবেছিল, লোকটি কিপটা বা গরিব। এখন দেখা যাচ্ছে, সবার কাপড় সে একাই দিয়ে দিলো। দিয়ে জিমির মাথায় আদর করে দিয়ে চলে গেলো। জমিলার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে মনে মনে। লোকটিকে নিয়ে জমিলার আগের ভাবনটা কত বড় ভুল ছিল! দুই হাতে সব জামা কাপড় নিয়ে বাইরে আসে। বাইরে বের হওয়ার পরে সবকিছুই জমিলার চোখে ভালো লাগে। জিমি যেন খুশিতে আকাশে ওড়বে অবস্থা।

Share Now
Author

Dr. Shafiqul Islam

(BBA, MBA, DU; Mphil, Japan; PhD, Australia) Deputy Secretary, Government of Bangladesh. Chief Executive Officer, Cumilla City Corporation, Local Government Division, Ministry of LGRD
error: Content is protected !!

My Shopping Cart