Detail

Home - সমাজ ও ধর্ম - প্রবন্ধ: ’মাজার রক্ষা না মাজার ভাঙ্গা। কোনটা যৌক্তিক?’ – সফিকুল ইসলাম

প্রবন্ধ: ’মাজার রক্ষা না মাজার ভাঙ্গা। কোনটা যৌক্তিক?’ – সফিকুল ইসলাম

মাজার একটি আরবি শব্দ। এটি ফারসি দরগাহ শব্দের প্রতিশব্দ। এর ধাতুগত অর্থ ‘জিয়ারতের স্থান’ বা ‘দর্শনের স্থান’। এ অর্থে চিন্তা করলে সব মুমিনের কবরই ‘মাজার’, কেননা সব মুমিনের কবরই জিয়ারতের স্থান এবং কবরই জিয়ারত করা হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে মাজার বলতে সাধারণত অলি-আওলিয়া, দরবেশগণের সমাধিস্থলকে বোঝায়। আরবিভাষী বিশ্বে মাজারকে মাকাম বলা হয়। আবার মাজারকে রওজা বা কবরও বলা হয়। ইসলামের নবী হযরত মোহম্মদ (স:) মদীনার কবরস্থান জান্নাতুর বাকিতে এবং উহুদের যুদ্ধে শাহাদতপ্রাপ্ত সাহাবিদের কবরস্থানে গমন করতেন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। সুফিতত্ত্বের অনুসারীরা সুফী দরবেশদের কবরস্থান জিয়ারত করতে পছন্দ করেন। অনেক মাজারে সমাধিস্থ ব্যক্তির ওরশ অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। একে ঈসালে ছওয়াবের মাহফিল বলে।

.

মাজার বিরোধীদের কেউ কেউ বলছেন যে, ইসলাম ধর্মমতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কেবলমাত্র আল্লাহ। নবী রাসূলগণও নিজেদের আল্লাহর দাস বলেছেন, নিজেরাই শিক্ষা দিয়েছেন যে “একমাত্র” আল্লাহর ইবাদত করতে, কিছু চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইতে, কারন দেবার ক্ষমতা কেবল আল্লাহর কাছেই আছে। আমাদের নবীজির (সঃ) জীবনী দেখলে আমরা দেখবো তাঁর চোখের সামনে এক কন্যা ফাতেমা ছাড়া বাকি সব সন্তান ইন্তেকাল করেছেন। যুদ্ধে আহত হয়েছেন, রক্ত ঝরেছে, ক্ষুধার যন্ত্রনায় পেটে পাথর বেঁধেছেন। তাঁর যাবতীয় মিরাকেল বা মুজেজার ঘটনা যাই আমরা শুনি, সবই হয়েছে আল্লাহর হুকুমে। আল্লাহর হুকুম যেখানে হয়নি, সেখানে কিছু ঘটেনি। কিন্তু আপনি বাংলাদেশের মাজারগুলোতে গেলে ভিন্নধর্মী প্রার্থনা দেখবেন। লোকজন মাজারে শায়িত মুর্দার কাছে প্রার্থনা করছে, মানত করছে, জিকির করছে, আজগুবি কাহিনী শেয়ার করছে, সেগুলোকে বিশ্বাস করাকে ঈমানী দায়িত্ব মনে করছে। অথচ আমরা জানি, ইসলাম ধর্ম মতে, একজন লোক যখন মারা যায়, তার যাবতীয় ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। সে কবরে শুয়ে শুয়ে আপনার সমস্যার সমাধান করবে কিভাবে? বুদ্ধিসুদ্ধি কোথায় থাকে?

তারা আরও দাবি করছে যে, মাজার ব্যবসা বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে বিলিয়ন টাকার নিচে কোন হিসাব পাবেন না। শবে বরাত, শবে মেরাজ, বার্ষিক ওরস ইত্যাদি সময়ে এই ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠে। এসব টাকা আদায়ের সাথে স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও জড়িত। অর্থ সকল অনর্থের মূল হলে সেখানে ভালো কিছু কীভাবে হবে। ভাল বলতে একটাই ঘটনা ঘটে, তা হচ্ছে গরিব মানুষের জন্য শিন্নি বিতরণ। সেটাও জনতার টাকায়, এবং তাও একশো টাকা দিলে হয়তো পাঁচ টাকা ব্যয় হয়। এছাড়া মাজার প্রাঙ্গনে মাদক নিষেধ করলে কাদের ক্ষতি হবে সেটা বুঝতে একটু বুদ্ধি খাটানোই যথেষ্ট। এছাড়া এইটা একটা ফ্যাক্ট যে ভারত উপমহাদেশে এমন বহু ঘটনা আছে যে খুনের আসামি, চোর, ডাকাত ইত্যাদি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে সাধু সন্ন্যাসীর বেশ ধরে মাজারে, শ্মশান ঘাট বা মন্দিরে আত্মগোপন করে থাকে। তেমনই আমাদের দেশেও মাজারে এইসব ভন্ড ফকিরদের উপর অভিযান চালালে বহু ফেরারি আসামি ধরা খাবে বলে তাদের বিশ্বাস। দেহব্যবসা থেকে আরও বহুকিছু চলে এইসব ভণ্ডামির আড়ালে।

বিপরীতে সুফিবাদের পক্ষরা বলছেন, তারা মাজার পুজা করে না, মাজারের কাছে কিছু চান না। মাজারের আওলিয়ার কবর জেয়ারত করেন। দোয়া করেন। যা চাওয়ার আল্লাহর কাছেই চান। শিক্ষার অভাব বা বোঝার অভাবে হয়তো কারও কারও বলার ধরণ বা ভাষা ভুল হতে পারে। কিন্তু মনে মনে আল্লাহ পাকের কাছেই যা চাওয়ার তা চান। তারা এও বলেন যে, সুফিবাদ বা পীর মাশায়েখের মাধ্যমেই এ দেশে ইসলাম এসেছে। ওনারা হচ্ছে ওলি আউলিয়া। তাঁরা আল্লাহ পাকের ও নবী করিম স: এর পথ দেখান। তাদের কাছে বায়াত হয়ে লাখ লাখ মানুষ মুসলিম হয়েছে। তাদের সোহবতে থাকা মানে হলো আল্লাহপাকের পথে থাকা। আলোকিত মানুষ তথা মুমিন ও আওলিয়াদের কথা শোনার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের দিদার পাওয়া সহজ হয়। মানুষ সে কারণে এসব জায়গায় যায়। যখন পীর মাশায়েখ ইন্তেকাল করেন, সেখানে খানকা গড়ে উঠে। মানুষ জিয়ারত করতে যায়। তাঁদের জীবনী ও কাজ ও অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে শুনে শুনে আরও বেশি ধার্মিক হয়। মন নরম হয়। সুতরাং মাজারের কোনো দোষ নেই, সব দোষ মানুষের। প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব।ব্যবসা কোথায় হয় না? যে দেশে মদের বার অনুমোদিত সে দেশে মাজারের গাঞ্জা কি দোষ করল? আর কোনো প্রতিষ্ঠানে গাঁজা পাওয়া যায় না? মাদ্রাসায় কি ছাত্রদের বলাৎকার হয় না? মাদ্রাসায় কি ব্যবসা-বাণিজ্য হয় না? অপরাধ ঘটে বলে মাজার ভেঙ্গে ফেলার ব্যাপারটা হচ্ছে  মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো।
সব ধর্ম গোত্র জাত-পাতে কিছু কুলাঙ্গার থাকে। এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মাজার ভাঙ্গা, মতের সাথে অমিল হলে মানুষ হত্যা করা এসব উচিত পন্থা না। আমরা তো আর অসভ্যতার যুগ এখন বাস করছি না। আমরা অনেক সভ্য কিন্তু কিছু মানুষের বাড়াবাড়ির আর ভুল ফতোয়ার কারণে আজ এই সব দিন দেখতে হচ্ছে।

 

..

মাজারবিরোধীরা বলছেন যে, রাসুল সাঃ যেখানে কবরকে উচু করতে বা এর চারপাশে উচু দেয়াল দিতে নিষেধ করেছেন সেখানে সেই কবর কে কেন্দ্র করে বিল্ডিং, লাইটিং, লালসালু ইত্যাদি হাবিজাবি লাগানোর তো কোনো প্রশ্নই আসে না। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিদাতী ও হারাম কাজ। একটি কবর কে কবর বলে মনে হওয়ার জন্য ন্যূনতম যতটুকু নির্দেশিকা প্রয়োজন বা এর সীমানা নির্ধারণের জন্য ন্যূনতম যতটুকু ঘেরা দেওয়ার প্রয়োজন ওলামায়ে কেরাম ঠিক ততটুকুরই অনুমোদন দিয়েছেন। আর আমাদের সমাজে এই মাজারকে কেন্দ্র করে যে শিরক,বিদাত ও হারাম কাজ প্রচলিত আছে সেগুলোর কথা তো বলাই বাহুল্য। ওরস, জলসা, মানত, গান বাজনা, নাচানাচি,লাফালাফি, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা….। কুরান হাদীস থেকে উদ্ধৃত্ত করে তারা দাবি করছেন যে মাজারের এসব কর্মকান্ড শরীয়াহ বিরোধী কাজ।

বিপরীতে পীরপন্থীরা বলছেন, মানুষের মন মারফত, তরিকত ও হাকিকত পর্যায়ে চলে গেলে এসব শরীয়াহর আলোচনা চলে না। চর্মচক্ষু দিয়ে দেখলে হবে না। মানুষ এসব দরগাহতে গিয়ে জিকির করতে করতে ফানাফিল্লাহ পর্যায়ে চলে যায়। তখন কী পরে, কী করে, কী গায় তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। দিদার লাভের জন্য ওলিআওলিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সাথে ধ্যানে ধ্যানে কানেকশন তৈরি হয়। সেসব বিষয় সাধারণ ধর্মজ্ঞান দিয়ে ও শরীয়ত দিয়ে বোঝা যাবে না। সাধারণ গান করা হারাম বটে। ওলিগণ ও তার আশেকগণ যখন গজল, গান ও জিকিরে মগ্ন হয়ে যান, তখন সেখানে যা ঘটে তা সাধারণ গানের আসর দিয়ে তুলনা করা যাবে না। আক্ষরিক কুরান হাদীসের বাণী দিয়ে নয়, নবী রাসুলের এস্ক মহব্বতের খেলা বুঝতে হলে কুরান হাদীসের গূঢ় অর্থ বুঝতে হবে। নবী রাসুলদের মাজেজা ও ওলি আওলিয়াদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বুঝতে হবে। এ কোনো সহজ খেলা নয় যে কয়েকলাইন কুরান হাদীস রিডিং পড়েই ফতোয়া দেওয়া যাবে।

মাজার বিরোধীদের অনেকেই মাজারের ভিতরে নারীপুরুষের অসামাজিক কার্যকলাপ ও ফকির মিসকিনদের অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের সমালোচনা করেন। মাজার ব্যবসা বা দরগাহ জিয়ারত এর নামে এসব অন্যায় অপরাধ কাজ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন।

বিপরীতে মাজারপন্থীরা বলেন যে, ওখানে কোনো অসমাজিক কার্যকলাপ হয় না। নারী পুরুষ সবাই সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে মজতেই সেখানে যায়। দোয়া করতে সেখানে যায়। দুয়েকজন ভুল করলে তার দায় পুরো মাজারপন্থী সকলকে দেওয়া যাবে না। এরকম দুচারজন ভুল করা লোক সমাজের সব জায়গাতেই আছে, তারা সব না ভেঙ্গে কেবল মাজার ভাঙতে আসবে কেন? ফকির মিসকিনরা এখানে আরাম করতে আসে, খেতে আসে, গোসল করতে আসে। কেউ যদি এখানে এসে শান্তি পায়, সেই শান্তি ভঙ্গ করতে তারা আসবে কেন? প্রত্যেকেরই অধিকার আছে তার নিজের জীবন যাপন করার। ফকির মিসকিন প্রতিবন্ধী নানান কিসিমের মানুষ এখানে এসে প্রশান্তি খুঁজে পায়। নবী করিম স: তাঁর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে যা যা বলেছেন তা তা মানলেও তারা এসব মাজার ভাঙতে আসতো না। তাদের কিছু বলার থাকলে তারা বলুক, আমাদেরকে বুঝাক, আমরাও আমাদের জানা কুরান হাদীস ও ইসলামের দিকনির্দেশনা দিয়ে তাদের বোঝাবো। তর্ক বিতর্কের মাধ্যমে যা হবার হবে। কিন্তু গায়ে হাত দেওয়া ও ভাংচুর করা  ইসলামের কোন ধারায় পড়ে?  মাজার চর্চার কারণে যদি তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে, আমাদের মাজার ভাংচুর করলে কি আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে না? আমাদের বিশ্বাস ও আকীদা আমাদের কাছে বড়, তাদের বিশ্বাস  ও আকীদা তাদের কাছে বড়।  তাদের কিছু বলার থাকলে তারা আইনের আশ্রয় নিক। আদালতে মামলা করুক।

মনে রাখতে হবে

নামাজ পড়ি কোমর বাঁকা

রোজা রাখি অঙ্গ শুকা

খাওয়াইলে হাজার ভূখা

এতিম মিসকিন।

মুসলেম হতে বহুদিন।

তথা মুসলিম হওয়া তত সোজা না। কে সঠিক কে বেঠিক তা নির্ধারণ তত সোজা না।

…….

এসব বিষয়ে মাজার পন্থী ও মাজারবিরোধী অবস্থান বাদ দিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে, প্রধানত পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হতে আগত বিভিন্ন ধারার সুফি সাধকদের মাধ্যমেই এই দেশে ইসলাম এসেছে। তাঁদের প্রচারিত মরমিবাদ এই অঞ্চলের মানুষকে নূতন ধর্মে দীক্ষিত হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাধারণত এরকম সুফি বা ধর্মীয় প্রচারকদের সমাধিক্ষেত্রকে কেন্দ্র করেই মাজার গড়ে উঠেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়; দক্ষিণ ও মধ্য এশীয় প্রায় সকল দেশেই ইসলামের এই ধারা স্থান গ্রহণ করেছে। অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হলো, শত-সহস্র বছর ধরে এ দেশে সমন্বিত ধারার যেই সংস্কৃতি গড়ে ‍উঠেছে, এতে এই ধারার ইসলামের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। ফলে খানকা ও মাজারকেন্দ্রিক ধারা খারিজ করবার অপচেষ্টা সামাজিক বুননকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আর সামাজিক স্থিতিশীলতা তো বটেই, রাষ্ট্রীয় সংহতিকেও দুর্বল করে তুলতে পারে। নিঃসন্দেহে মাজার সংস্কৃতি নিয়ে তর্ক রয়েছে; যেইরূপ তর্ক রয়েছে সুন্নি, শিয়াসহ ইসলামের বিভিন্ন ধারা ও উপধারা নিয়ে। কিন্তু একে অপরকে হামলার মাধ্যমে এই সকল তর্কের নিরসন কস্মিনকালেও সম্ভব নয়; তজ্জন্য বড়জোর নিয়ম-নীতি মেনে পরস্পরের মধ্যে বিতর্ক হতে পারে। মনে রাখতে হইবে, যেই গণতন্ত্রের জন্য সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কয়েক শত মানুষ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে; কয়েক সহস্র মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, সেই গণতন্ত্রেও এক বিশ্বাসের মানুষ– তার ধর্ম বা অন্য যেই কোনো বিষয়ে হোক; ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে শারীরিক তো বটেই, মানসিকভাবেও আঘাত দিতে পারে না। স্মরণে রাখতে হবে, যে কোনো ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা প্রচলিত আইনে গুরুতর অপরাধ। এমনকি অপরের ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবু এরকম অপরাধ দিনের পর দিন এক প্রকার বিনা বাধায় সংঘটিত হচ্ছে।

 

তদুপরি এই সকল অপকর্ম এমন সময়ে ঘটছে যখন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশেষত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। “আমরা এ ব্যাপারটি খুব সিরিয়াসলি দেখছি। এই ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে ব্যাপারে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এর বিরুদ্ধে প্রথমদিন থেকে অবস্থান নিয়েছি। আমরা বারবার বলছি, আমাদের প্রতি ফ্যাসিবাদী শাসকের পক্ষ থেকে যে আচরণ করা হয়েছিলো, সেই ধরনের আচরণ যেন কারো প্রতি কোনোভাবেই না হয়, সেটি নিশ্চিত করবো। মাজার ভাঙ্গা হোক, মসজিদ ভাঙ্গা হোক, মন্দির ভাঙ্গা হোক; এগুলো গর্হিত কাজ। যেগুলো যেভাবে আছে, সেগুলো সেভাবে থাকা দরকার আমরা দেশবাসীকে জানাতে চাই, আমাদের কম্যুনাল হারমোনি-ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট হওয়ার মতো কোনও ঘটনা যদি ঘটে, আপনারা আমাদের জানালে আমরা মুহূর্তের ভেতরে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।“ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে উপাসনালয়ে যারা হামলা চালায়, তারা মানবতার শত্রু, তারা ক্রিমিনাল।‘‘

বিষয়টাকে বোঝার জন্য দুই ঘরণার দুইজনের কাল্পনিক বাহাসটা একটু পড়ি। তাতে করে স্পষ্ট না হলেও আবছা একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

মাজার বিষয়ক কুতর্ক।

…….

: দরগায় যাওয়া হারাম- তা আপনারা বলেছেন। আমরা তা মনে করি না। আপনারা কীসের ভিত্তিতে বলেন যে দরগাহে যাওয়া হারাম?

: আমরা বলবো কেন? কুরআনে স্পষ্ট করে বলা আছে। কোন কবরকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করা বড় শির্ক, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ এবং তারা যেন এই সুসংরক্ষিত (পবিত্র) গৃহের তওয়াফ করে। (সূরা হাজ্জঃ ২৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ্! আমার কবরকে পূজার স্থানে পরিণত করো না, যাতে এর ইবাদত করা হয়। আল্লাহ্ অভিশাপ করেছেন ঐ জাতিকে যারা তাদের নবীদের কবর সমূহকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরী করেছে।’’ (মুসনাদে আহমাদ) আবু হুরায়রা (রাঃ) এর সূত্রে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ ইহুদী খৃষ্টানদের প্রতি আল্লাহর লানত। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।’’ আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবুল হায়্যায আল আসাদীকে বলেন, আমি কি তোমাকে এমন আদেশ দিয়ে প্রেরণ করব না, যা দিয়ে নবী (ﷺ) আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? কোন মূর্তি পেলেই তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবে। আর কোন কবর উঁচু পেলেই তা ভেঙ্গে মাটি বরাবর করে দিবে।’’ (মুসলিম)  সুরা ৭২ এর ২০-২৩ নং আয়াতে বলা আছে। ‘ কেবল আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর সাথে আর কাউকে মিলাই না‘‘। সুরা ৭ এর ১২৮ নং আয়াতে বলা আছে, ‘‘কেবল আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও ও ধৈর্য় ধরো।‘‘ কুরানের বহু আয়াত ছাড়াও অনেক হাদীস আছে যেখানে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ পাক ছাড়া আর কারও কাছে কিছু চাওয়া যাবে না। একমাত্র আল্লাহই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।

: আমরাতো আল্লাহর কাছেই চাই। যেহেতু আল্লাহর ‍ওলি শুয়ে আছেন। তার মাজারে যাই। তার জীবনী স্মরণ করি। আল্লাহ পাক তার যে মুমিন বান্দাকে পছন্দ করেন তার ওসিলা করে যেন আমাদেরকে মাফ করেন সেটা বলি। ক্ষমতাতো সব আল্লাহ পাকেরই। নবী রাসুল, গাউস কুতুব , ওলি আওলিয়া কেন পাঠিয়েছেন আল্লাহ পাক? আল্লাহ পাকের কথা বলার জন্যই। তারাইতো আমাদেরকে হেদায়েতের পথে আনার জন্য কাজ করেছেন। তাদের মাধ্যমেই লক্ষ কোটি মানুষ হেদায়েতের পথে এসেছেন।

: মাজারে ভক্তি করা বা মাজারে মানত- এসবতো হারাম। কুরআন হাদীসে এসব বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

: মাজার জিয়ারত করা যাবে না, পীরের কিছু চাওয়া যাবে না, মানত করা যাবে না- এগুলো আপনার ফতোয়া। এগুলো আপনি বিশ্বাস করেন। যে এগুলো বিশ্বাস করে না তার উপর জুলুম করা যাবে না। যে পীর মানে, মানত করে, জেয়ারতে যায়- সেটা তাদের বিশ্বাস। তাদেরকে সেটা করতে দেন। আপনার ভিন্নমত থাকলে তা তাকে বলেন। সুন্দর করে বলেন। আদব লেহাসের সাথে বলেন। আপনার মত আমার মত নাও হতে পারে।

: মাজারে বসে আপনারা সিজদা দেন, মাজারকে কেবলা করে নামাজ পড়েন, মাজারের পীরের কাছে দোয়া করেন, আশা পূরণের জন্য।  এগুলো কি আল্লাহর সাথে শিরক নয়?

: এগুলো মাজারে আসা কিছু সাধারণ মানুষ করে। না বুঝে করে। এগুলো বন্ধ করার জন্য মাজারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাইনবোর্ড টানানো আছে। মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব লোকের জন্য তো মাজার বাতিল করা যেতে পারে না। বড়জোর এসব লোককে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

: যদি আপনারা আল্লাহর কাছেই সব চান, তবে মাজারে যান কেন? দরগাহতে কী কাজ? ঘরে বসেইতো আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন। ঘরে বসেই দোয়া করতে পারেন।

: মাজারে বা দরগাহতে যাই প্রয়াত ওলি আওলিয়ার কবর জিয়ারত করতে।  যিকির করি। এ যিকির নীরবে বা উচ্চ স্বরে দু ভাবে হতে পারে, জিকিরের মাধ্যমে পরম সত্তার সাথে লীন হতে হয়। মাজারের সামনে গিয়ে বসে মন ভরে দোয়া করতে ভালো লাগে। যে কোনো কবরস্থানে গিয়ে জিয়ারত করা গেলে ওলি আওলিয়ার মাজারে গিয়ে জিয়ারত করা যাবে না কেন?

: কেবলতো জিয়ারত করেন না, গান বাজনাও করেন। ইসলামে গান করা হারাম। গান বা বাদ্যযন্ত্র নিষেধ। সেগুলোও আপনারা নিয়মিত করেন।

: মাজার একটা স্মৃতি, সেখানে সবাই আসি। সেখানে গান বাজনা হয়। গান বাজনা করি। গান বাজনা ভালোবাসি। শামা সঙ্গীত গাই। আলাহর উদ্দেশ্যে প্রেমমূলক যে সংগীত যা আধ্যাত্মিক ভাব তন্ময়তা জাগিয়ে তোলে তাই শামা। গান বাজনা হারাম্ এটা আপনার বিশ্বাস। আমাদের বিশ্বাস না। আপনি আপনার বিশ্বাসে থাকেন, আমরাতো মানা করছি না। আমাদের বিশ্বাসে কেন আপনারা আঘাত হানবেন? আমরা গান গাইতে গাইতে বাজনা বাজাতে বাজাতে নাচতে নাচতে সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে পতিত হই। পৃথিবীর নানান দিকে ইসলাম যেভাবে গিয়েছে সেখানে এসব কালচারাল দিকসহই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে।

: কিন্তু কুরআন হাদীসেতো সুষ্পষ্টভাবে গান বাজনা নিষেধ করা হয়েছে। ‘‘তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।‘‘-সূরা ইসরা : ৬৪ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯. ‘‘তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কর না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।‘‘-জামে তিরমিযী হাদীস : ১২৮২; ইবনে মাজাহ হাদীস : ২১৬৮

: ইসলামে গান নিষিদ্ধের যেসব হাদিস পাওয়া যায় তা সবই বনু উমাইয়া আমলে তৈরি। আপনি কুরানে গানের বিরুদ্ধে কোনো আয়াত দেখাতে পারবেন না। তৎকালীন গীতিকার, গায়ক, কবিরা তাদের গানে গানে উমাইয়াদের সমালোচনা করত। তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ধর্মের চেয়ে বড় অস্ত্র আর কী হতে পারে? গোয়েবলসরা ঐ যুগেও ছিল। এসব হাদিস খলিফাদের সপক্ষে প্রচারিত হয়। ক্রমে ক্রমে সেগুলো টেক্সটে স্থান পায়৷ গান গাওয়া যাবে না- টাইপের আপনার কুরানিক ব্যখ্যা আপনাদের কাছে। আমাদের ব্যখ্যা আমাদের কাছে। আপনাদের ব্যখ্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসেন, বলেন। আমরা শুনি। দেখেন আমরা কনভিন্সড হই কিনা। : কুরানের বাণী নিজের মতো অনুবাদ করলেই হবে না। তা বোঝার মতো প্রজ্ঞাও লাগবে। যে কোনো বাণীর শানেনুযুল ও ব্যখ্যা বুঝতে হবে।  আল্লাহ কেবল কুরানই দেয় নি। আল্লাহ আপনাকে বুদ্ধিও দিয়েছে। আপনাকে বিচার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, জ্ঞান দিয়েছে। ইসলাম মানবতার কথা বলেছে, সাম্যের কথা বলেছে, ইসলাম ন্যায়বিচারের কথা বলেছে। সব ভুলে গিয়ে কেবল আক্ষরিক অনুবাদ নিয়ে পড়ে থাকলে হবে?

: আপনাদের কারণে আপনাদের মাজার পূজার কারণে আপনাদের বিদাতের কারণে ইসলামের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হচ্ছে। অন্য ধর্মের মানুষ  আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলে হাস্যরস করছে। আমরা আমাদের ইমানি দায়িত্ব মনে করি এসব মাজার ব্যবসা বন্ধ করা। তাই আমরা সকল মাজার গুড়িয়ে দিব।

: সৌদি সালাফিরা যুক্তরাষ্ট্রে ঘাটি সরাতে পেরেছে? তেল বিক্রি বন্ধ করতে পেরেছে? তারা কি ইজরাইলের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছে? তারা মাজার ভাঙ্গায় এত সমর্থন করে কেন? মাজার নরম জায়গা বলে? মাজারে যারা থাকে তারা মারমুখী না বলে? পারলে ইজরাইল বা এরকম ক্ষমতাধরের বিরুদ্ধে গিয়ে জিহাদ করেন। সালাফিদের কথামতো নেচে বাংলার মাজারে উগ্রতা দেখাবেন না।

: নবী রাসুলের নির্দেশনা অনুসারে আমরা ইসলামের সঠিক পথ মানুষের মধ্যে প্রচার করি। আমাদের সামর্থ অনুসারে যেখানে সম্ভব তা বাস্তবায়ন করি। এটাতো আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব।

: মানুষকে ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গরু ছাগলকে দেওয়া হয় নি। কারণ মানুষের বিচার বিবেচনা যুক্তি তর্ক চিন্তা করার ক্ষমতা রয়েছে। আল্লাহ পাক মানুষকে এ গুণ দিয়েছেন। তাই মানুষ যা গ্রহণ করবে তা যুক্তি তর্ক দিয়ে গ্রহণ করবে, যে বর্জন করবে তা যুক্তি দিয়ে বর্জন করবে। সুতরাং আপনারাও প্রচার করেন। কিন্তু জোর জবরদস্তি করার দরকার নেই। আমরাও প্রচার করি। ভক্তি, সুন্দর কথা ও তাজিমের সাথে প্রচার করি। আপনারাও করেন।

: সত্যি করে বলেনতো, আপনারা কি মাজারে কেবল জেয়ারত করতে যান, নাকি রং তামাশা করতে যান। বেশিরভাগ মাজারে গেলেতো নানান রকম তামাশা দেখা যায়। গাঁজার গন্ধে চারপাশ ধুমায়িত, নারী পুরুষ নাচানাচি ম্যাসাকার অবস্থা। এখানে ইসলাম কোথায়?

:চট্টগ্রাম সিলেটসহ বেশিরভাগ মাজারে কোনো রকম গান বাজনা লাফালাফি কিছু নেই। কিন্তু শহরের বাইরে যেসকল মাজার আছে সেখান অনেক রকম শিরক বেদাত মাদকের ঘটনা ঘটে। সেখানে মানুষের ঢলাঢলি নাচানাচি ফালাফালি সব চলে। বাস্তবতা হলো অনেক গরীব মানুষ এখানে এসে আনন্দ পায়। এমনকি অন্য ধর্মের লোকজনও আসে। নানান মানত করে, দান করে। গরীব ফকির মিসকিন সবে মিলে ধর্মীয় গানে গানে মেতে ওঠে। এসবকে অনেকে “গরিবের আনন্দ” বলে মনে করে। গরীব মানুষের জন্য ওটাই একটা বিনোদন, তাই ওখানে সবাই লাফালাফি ফালাফালি করে। আসলে সবাই আধ্যাত্মিক শান্তি ও মুক্তি চায়। একেক জন একেক ভাবে পায় তারা হয়ত মাজারে গিয়ে লাফালাফি করে এসবে লিপ্ত হয়ে মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রত্যাশা করে। গাইতে গাইতে যিকির করতে করতে নিজেকে হারাই। এটা হচ্ছে এক ধরনের আধ্যাত্মিক মানসিক অবস্থা যা তার অন্তর দৃষ্টি লাভে সাহায্য করে। সুফিদের কাছ থেকেই ভক্তরা এসব শিখে, রপ্ত করে।

: স্বীকার করার জন্য ধন্যবাদ। পাগলরা ঢোকে পাগলামি করে। একজন ধার্মিক মুসলমান, ইসলাম সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান না রাখলেও, কোন কাজটি ইসলামে শোভা পায় তা অন্তত বুঝতে পারে। আমাদের উপমহাদেশে অসংখ্য-অগনিত মাজার রয়েছে। আর, এই মাজার বলতে আমি বুঝাচ্ছি কবরের মাজার। কেননা মাজার অর্থ হচ্ছে বাগান। তো, কবরে গিয়ে নাচানাচি করা একধরনের পাগলামি, যারা এটা করে তারা আসলেই পাগল। এসব পাগলামি একটু পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে আপনার চোখে একটি বিষয় দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, এই পাগলগুলো কিছুটা ভন্ড-সাধু প্রকৃতির। অর্থাৎ ঘর-বাড়ি,সমাজ-সংস্কৃতি,ধর্ম-কর্ম স্ত্রী-সন্তান সব ছেড়ে দিয়ে তারা সেখানেই অবস্থান করছে, এবং সাধুগিরীর নামে সব অসাধু  কাজ (মদ্যপান,গাজা,ইয়াবা,ইত্যাদি সেবন) করছে। সমাজের সরলমনা মানুষগুলোর আবেগ-অনুভূতি আর অন্ধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে হাতিয়ে নেয়া হয় লক্ষ-লক্ষ টাকা। তা  দিয়েই তারা নিজেদের মাঝে বন্টন করে এই অসাধু কাজগুলো বা তাদের নোংরা চাহিদাগুলো সম্পূর্ন করছে।

: যারা পাগলামি করে বা বাড়াবাড়ি করে তাদের কথা আলাদা। এজন্য মাজার বা ওলি আউলিয়াকে দায়ী করা যায় না। আচ্ছা বলুনতো, কোনো ব্যাক্তি যদি মুর্তিপূজা করে, তাহলে এর জন্য কি ইসলাম বা মুসলমানদের কে দোষ দেয়া যাবে? যাবে না। কারণ তারা তো এটা স্বীকৃতিতো দূরের কথা বরং ঘৃণা করে। একই ভাবে যারা মাজারে বৈধতার নামে অবৈধ নাচানাচি নামক পাগলামি করে যাচ্ছে, তাদের দায়ভার ইসলাম কিংবা মুসলমানদের উপর বর্তাবে কেন? মাজার বা আউলিয়ার উপর চাপনো কেন? ইসলাম তো এটার স্বীকৃতি দেয়ইনা বরং নিষেধ করে। তাইনা? এই সহজ সমীকরণগুলো আমাদের সমাজের যেকোনো সচেতন ধার্মিক মানুষই বুঝে! কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, অনেক পন্ডিত ব্যাক্তিরা জানে এবং বোঝে যে, ইসলামে এর কোনো স্থান নেই। তবুও তারা ইসলামকে সমালোচিত করার জন্য বিষয়টিকে না জানার ভান করে অপপ্রচার চালায়!

: কবরে সিজদাহ করা হারাম। (বুখারী: ১৩৩০); কবরকে মসজিদ বানানো হারাম। (আবু দাউদ ৩২২৭,নাসায়ী ২০৪৭)  কবরের উপর বসা ও সালাত আদায় নিষিদ্ধ ।  (মুসলিম ২১৪০,নাসায়ী ২০৪৪), কবরের মধ্যে ওরস-মেলা এবং কবরকে উৎসবের স্থান বানানো হারাম। (আবু দাউদ:২০৪২), রাসুল(ﷺ)বলেছেন, মসজিদুল হারাম,মসজিদুল আক্’সা ও মসজিদে নববী ছাড়া অন্য কোন মসজিদে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবেনা। এরকম আরও অনেক হাদীস আছে।

: আমরাতো এগুলো করি না। আমরা কেবল মাজার যিয়ারত করি। আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করি, সকলের নাজাতের জন্য। দোয়া করি আশা পূরণের জন্য। এর বাইরে যারা এসব করে তারা আসলে নিয়ম ভাঙার দলে। এর দায় মাজার বা মাজার কমিটিকে দেওয়া যাবে না।

: এটা কি অস্বীকার করতে পারবেন যে মাজারের ফান্ড কালেকশনের কোনো যথাযথ হিসাব রাখা হয না। খরচের কোনো নিয়মনীতি নেই। বছরশেষে তৃতীয়পক্ষ দ্বারা অডিট করা হয় না। মাজারের খাদেম বা কমিটি তহবিল তসরূপ বা অনিয়ম করে। সমাজ ও রাজনীতির নেতাদের সাথে হাত মিলিয়ে সব সাবাড় করে। সাথে কিছু হুজুরও রাখে। মিলেমিশে চুরি। কোনো আওয়াজ নেই। তাছাড়া মাদক কারবারি ও চোরাকার্বারিদের সাথেও নাকি মাজারের লোকদের সংশ্লেষ থাকে।

:মানুষের দানকে যথাযথ কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়। সমাজ ও দেশের সব জায়গায় যেহেতু চোর আছে, যেহেতু দেশের সকল মসজিদ কমিটি খাঁটি মুসল্লি না, সেহেতু মাজারের খাদেম ও কমিটির লোকে সবাই ফেরেশতা এমন দাবি আমরা করতে পারবো না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমাদের শোধরাবার ও সচেতন হওয়ার সুযোগ আছে। আর আপনারাও দেশ, সমাজ সব ঠিক করে তারপর মাজার ঠিক করবার আসেন। পুরো সমাজে চোর বিরাজমান হরে, মাজার দরগাহতেও তাই হবে। মাজারে যেহেতু সকল ঘরাণার লোক আসে, সেহেতু মাদকাসক্ত ও চোরকারবারিদেরও কানেকশন থাকতে পারে। কার মনে কী আছে কে জানে। মাজার কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। হাতে ফোড়া হলে আমরা ফোড়াই কাটি, হাত কেটে ফেলি না।

:যত কথাই বলেন, কোনো লাভ নেই। আমরা কুরআন হাদীসের অক্ষরে অক্ষরে মানি। এর বিরোধী যে কোনো কার্যক্রম আমরা রুখে দিবো। যারা এসব করবে তাদেরকে দেখে নেওয়া আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। প্রয়োজনে জোর করে ব্যবস্থা নিব। আমাদের গায়ে এক বিন্দু রক্ত থাকতে কুরআন সুন্নাহ বিরোধী কোনো কাজ হতে দিবো না।

: আপনারা বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা বা আলেয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক ছাত্রদের নিয়ে মোব তৈরি করেন। তাদের নিয়ে হামলা করেন। শক্তি আছে করবেন। তবে মনে রাখবেন যদি একটি মাজার ভাঙেন বা ধ্বংস করেন, তবে আরও শত মাজার তৈরি হবে। যদি একজন মাজার জিয়ারতকারীকে আক্রমন করেন তবে লক্ষ মাজারপন্থী তৈরি হবে, যদি মাজারে থাকা যে কোনো শান্তিপ্রিয় বাউল পাগলদের গায়ে হাত তুলেন, তবে হাজারও বাউল তৈরি হবে। তথা মাজারপন্থী তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আপনি কয়জনকে আটকাবেন, কয়টি মাজার ভাঙবেন? কয়দিন আক্রমন করবেন? যারা নিপীড়িত ও অসহায়  তাদের উপর আক্রমন হলে তারা ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়ে, দিনে দিনে বাড়তে বাড়তে কোটি মানুষের রূপান্তর হয়।

: আপনি কি হুমকি দিচ্ছেন? হুমকি দিয়ে লাখ লাখ মুসলমান জনতাকে ধাবিয়ে রাখা যাবে না। ইসলামের সুরক্ষার জন্য কুরআন হাদীসের সুরক্ষার জন্য তারা প্রয়োজনে জীবন দিবে।

: আমরা হুমকি দিলাম কোথায়? আমরা যেমন শান্তিপ্রিয় আছি, তেমনি থাকবো। আপনারা আক্রমন করলে যে মানুসের মনের ভিতরে মাজার প্রীতি তৈরি হবে, সেটা মনে করিয়ে দিলাম। আমরা কখনও কারো কাছে জোর করে ধর্ম প্রচার করি না। অহিংসা ও প্রশান্তির পথই আমাদের পথ। বরং আমরা ধৈর্য ধারণ বা আত্নসংযম করি। আত্মসংযমী হই। সকল বিপদে ধৈর্য ধারণ করি এবং ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিই। পবিত্র ভাবনা করি। দেহ এবং মন পবিত্র রাখি কারণ অন্তরের পবিত্রতার উপর আল্লাহর জ্যোতি প্রতিবিম্ব হয়। মানুষের প্রতি ভক্তি বা প্রেম রাখ। ভয়ে নয় প্রেমে আল্লাহর দিদার লাভ করতে চেষ্টা করি। আল্লাহর প্রেমে জাগতিক সবকিছু ত্যাগ রি। ভয়ে নয় প্রেমের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দিদার লাভই আমাদের লক্ষ্য। ধ্যান করতে করতে ফানাফিল্লাহ পর্যায়ে যাই। যেখানে আলাহর সংগে সম্মিলনের মুহূর্তে যাই। তখন জাগতিক বিষয়ের সকল চাওয়া পাওয়ার অবসান হয়। এই স্তরে আমাদের নিজের কোন চাওয়া পাওয়া থাকে না। যেটাকে বলে মরার আগে মরা। আল্লাহর প্রেমের মরা। এর পরে আমরা আল্লাহর চেতনার সাথে অন্তর্লীন হয়ে যাই। তখন আমার বা আমিত্ব বলে কিছু থাকে না।

 

: এসব আলাপ হচ্ছে ভন্ডামি। মাজারে বসেই আল্লাহর কাছে চলে যাওয়া। যত্তসব। এসব মাজারে ঘুরাঘুরি, নারীপুরুষ দিনরাত থাকা, ইবাদতের নামে নানান কাজকর্ম –এগুলো বিদআত। যা আগে কখনও ছিল না, যা কুরআন হাদীসে বলা নেই, তা পালন করাই বিদআত। আপনারা বিদআতে লিপ্ত।

:কুরআন হাদীসে নেই এমন অনেক বিষয় ইজমা কিয়াস দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। যা এখনও মানুষ পালন করছে। আর বিভিন্ন কবর জিয়ারত এগুলো নবী করিম স: এর জীবদ্দশায় যেমন ছিল। তাঁর ওফাতের পরেও ছিল। খেলাফত আমলেও ছিল। এসব বন্ধ হয়েছে কেবল ২০০ বছর আগের কথা। ১৮ শতকের শুরুর দিকে আব্দুল্লাহ বিন সৌদের সময় থেকে এ সমস্যা তৈরি হয়। সৌদ ও ইবনে তাইমিয়ার অনুসারি ইমাম ওহাবের সমন্বয়ে সৌদি শাসন ব্যবস্থার যে পরিবর্তন হয় তার মাধ্যমেই সকল কবর জিয়ারত বন্ধ হয়। এমনকি নবীজির রওজাও ভাংচুর করতে চেষ্টা হয়েছিল। যা ওসমানীয় খেলাফতের মাধ্যমে রক্ষা পেয়েছে। সৌদ, ফয়সাল, খালিদ, ফাহাদ, আব্দুল্লাহ ক্রমানুসারে সৌদি এলাকা শাসন করে যায়। যে কারণে সাহাবাদের কবর, হযরত আলী কিংবা ফাতেমা রা:, হাসান হোসাইনের কবরও সুরক্ষা করা সম্ভব হয় নি। সৌদ-ওহাবির হাত ধরেই বিদআতের ফতোয়া ছড়িয়ে পড়ে।

: এসব সৌদ ওহাবের আলোচনা দিয়ে কুরআনকে বাদ দেওয়া যাবে না। সৌদ ওহাব যাই বলুক না কেন, আমরা কেবল কুরআন হাদীসে যা লেখা আছে – তাই মানি। এসব ইতিহাসের প্যানপ্যনানি দিয়ে আমাদেরকে দমানো যাবে না।

: কুরআন হাদীসে যা আছে আমরাও তাই মানি। কুরআন হাদীসে আল্লাহ পাকের সাথে কাউকে শিরক করতে না করেছে, আমরা তা করি না। ওলি আউলিয়ার কাছে কিছু চাইতে না করেছে, আমরা চাই না। কিন্তু কবর জিয়ারত বা  আল্লাহর কাছে দোয়া করতে তো নিষেধ করা হয় নি। আমরা ওলি আওলিয়ারা যে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন, সেসব পথেই চলি। আমরা যেসব সুফিদের মানি সেসব সুফীদের রয়েছে বিভিন্ন তরীকা। স্থান ও কাল অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরীকা আত্মপ্রকাশ করেছে। তার মধ্যে কয়েকটি তরীকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—১. গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা, ২. সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি (রঃ) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা, ৩. গাউছুল আজম হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া মাইজভান্ডারীয়া, তরিকা, ৪. হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং ৫. হযরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।

: মাজারে এরকম হয় না। মাজারে বড় বড় আওলিয়াদের নাম বিক্রি হয়। মূলত অনেকেই যায় মাজারের কাছে দাবি করতে। অনেকেই সরাসরি মাজারের কাছে বা শায়িত ওলির কাছে বিভিন্ন আশা পূরণের আর্জি করে।

: হাজার হাজার মানুষ  আসে। এর মাঝে কেউ যদি এসে ভুল করে, তাকে ভুল পথ থেকে শোধরানোর দায়িত্ব আমাদের আপনাদের সবার। তাই বলে, মাজারে যাওয়া যাবে না, মাজার ভাঙতে হবে, মাজারকে পাকা করা যাবে না, মাজার সুরক্ষা করা যাবে না- এগুলো বাড়াবাড়ি রকমের ফতোয়া।

: বুঝছি, সারারাত বোঝালেও আপনারে সঠিক পথে আসবেন না। বিদআত ও পাগলামি করেই যাবেন। ধর্মগ্রন্থ বোঝার মনন আপনাদের হবে না।

: আমরাও বুঝছি, হাজার বোঝালেও আপনারা তালগাছ আমার – এ প্রবাদের মতো অবস্থায় থাকবেন। ধর্মগ্রন্থ বুঝেন, কিন্তু ধর্ম বুঝেন না।

Share Now
Author

Dr. Shafiqul Islam

(BBA, MBA, DU; Mphil, Japan; PhD, Australia) Deputy Secretary, Government of Bangladesh. Chief Executive Officer, Cumilla City Corporation, Local Government Division, Ministry of LGRD
error: Content is protected !!

My Shopping Cart