বর্ষানামা – ড. সফিকুল ইসলাম
স্কুলে যখন পড়তাম তখনকার কথা। মাস্টার মশাই প্রিয় ঋতু নিয়ে লিখতে বললে সবাই বসন্ত নিয়ে লিখতো। আর আমি লিখতাম বর্ষা নিয়ে। এ নিয়ে আমাকে সবাই পঁচাতো আর খেপাতো। বলতো বর্ষা হলো স্যাঁতস্যাঁতে কাদা মাটি পিছলা আর ঘরে বসে বিষণ্ণ সময় কাটানো। এটা আবার প্রিয় ঋতু হয় কী করে। আমি তখন তত ভালো করে জবাব দিতে পারতাম না। যদিও বর্ষা নিয়ে আমার স্মৃতি বিস্মৃতির নানান রসদ রয়েছে, রয়েছে ভালো লাগার অজস্র বিষয়। তবুও ওদের কথার উত্তরে আমি চুপ থাকতাম আর মিনমিনে গলায় কিছু একটা বলতাম যা তাদের কানে পৌঁছতো কিনা তা আমার জানা নেই। পরে যখন জেনেছি যে রবি ঠাকুর আর হুমায়ুন আহমেদের প্রিয় ঋতু বর্ষা এবং তাঁরা দুজনেই এ বর্ষা নিয়ে বিস্তর লিখেছেন এবং অনেক পাগলামিও করেছেন। তখন ভাবছি, ইশ যদি আগে এসব জানতাম তবে স্কুল বন্ধুদেরকে আরও কঠিন করে জবাব দিতে পারতাম। শুনে ওদের থোতা মুখ ভোতা হয়ে যেতো।
বৃষ্টি নিয়ে আমার সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল পুকুরে গোসল করা। যখন অঝরে বৃষ্টি ঝরতো তখন পুকুরে মাথাটা একটু ডুবিয়ে বৃষ্টির আওয়াজ শুনতাম। যেন পুরো পুকুর জুড়ে খৈ ফুটতেছে। এ খৈ ফোটার আওয়াজ শোনার জন্য পুরো বৃষ্টির সময়টা পুকুরে নেমে থাকতাম। চোখ লাল হয়ে গেলেও মাথা হালকা ডুবিয়ে বৃষ্টির আওয়াজ শোনা বন্ধ করতাম না। আরেকটা মজার ঘটনা ঘটতো। যখন বৃষ্টি থামতো তখন পুকুর, খাল, ঝিল থেকে কৈ মাছ উজান বেয়ে বেয়ে ডাঙায় উঠতো। আমরা তখন একটা একটা করে কৈ ধরতাম আর কলসীতে ভরতাম। কলসী ভরে তবেই ফিরতাম। চোখে মুখে আমাদের আনন্দ দেখে মা নানুর মুখেও খুশির ঝিলিক দেখা যেতো। আরেকটা দু:খস্মৃতিও আছে। বর্ষাকালে গ্রামে এ বাড়ি ও বাড়ি হাঁটতে হাঁটতে কাদা হয়ে যেতো। কাদাতে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে ঘা হতো। সেই ঘা সহজে ভালো হতো না। দিন দশেক যেতো ঘা নিয়েই। এবং তখন এটার জন্য কোনো ওষুধ খাওয়ানো হতো না। একটাই ওষুধ ছিলো সেটা হলো বাত্তি দেওয়া। বাত্তি দেওয়া কী তা বুঝিয়ে না বললে আপনারাও এখন বুঝতে পারবেন না। শুকনো পাঠশোলা হাতে নিয়ে কেরোসিন তেলের বোতলে ডুবাতাম। পাঠশোলার মাঝখানের ছিদ্রে কিছু কেরোসিন ঢুকতো। সেই পাঠশোলাটা কেরোসিনের বোতল থেকে বের করে দ্রুত আগুনের কুপি থেকে আগুন ধরিয়ে পায়ের উপরে ধরতে হতো। ধরলেই পাঠশোলার ভেতর থেকে গরম গরম কেরোসিনের ফুলকা পায়ে পড়তো। পায়ের ফাঁকে যেন পড়ে সেটা খেয়াল রাখতে হতো। একেকটা ফোটা পড়া মানে একেকটা চিতকার। কারণ প্রচন্ড ব্যথা ও জ্বলতো। যত জ্বলতো তত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা – এটাই ছিল বিশ্বাস। এটার বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যখ্যা আছে কিনা জানি না। তবে আগুনের কারণে জীবানুমুক্ত হয়ে থাকতে পারে।
গ্রামে টানা বৃষ্টি হলে সেটাকে ঘাদলা বলতো। ঘাদলা হলে ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় থাকতো না। তখন লুকোচুরি খেলতাম। নানার বাড়িতে একটা বাংলা ঘর ছিল। সেই ঘরে রাখা ছিল শুকনো পাটের গাইট স্তুপ করে। লুকোচুরি খেলার সময় আমাদের কবির মামা এ পাঠের গাইটের ভিতরে ঢুকে গেলেন। যেন মনে হয় এটা গাইটই। কোনোভাবেই আমাদের দল কবির মামাকে খুঁজে পেল না। কুক্কু কু ডাক শুনে আমরা ওই ঘরে যাই, পাটের গাইটগুলোর সব সাইট চেক করি, এমনকি পাটের গাইটের উপরে উঠে নাচানাচিও করি। কিন্তু কবির মামা নড়তেন না। আমরা যখন হাল ছেড়ে দেই ও হার মানি তখন তিনি পাটের গাইট থেকে বের হন। সে এক অচিন্তনীয় বিষয়। এতক্ষণ এরকম পাটের গাইটের ভিতরে শ্বাস কম নিয়ে থাকতে পারা খুবই কঠিন বিষয়। মামার দল জিতে খুশি হয়েছিল, আর আমরা হেরে গিয়েও অবাক হয়েছিলাম। খেলার জন্য এত বড় ঝুঁকি!
বৃষ্টির পরের সময়টা আমার খুব ভালো লাগতো। উঠোনে কিংবা পুকুরে, সবুজ ফসলি ক্ষেতে কিংবা বিলে ঝিলে খালি পায়ে হাঁটতে আমার দারুণ লাগতো। রঠি ঠাকুর যেমনটি বলেছেন, বৃষ্টিশেষের হাওয়া কীসের খোঁজে বইছে ধীরে ধীরে, গুঞ্জরিয়া কেন বেড়ায় ও যে বুকের শিরে শিরে। বৃষ্টির দিয়ে আরেকটা কাজ ছিলো আমাদের খুব স্বাভাবিক বিষয়। জমিতে বা মাঠে ফুটবল খেলা। কাদায় মাখামাখি হয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলাতে আমাদের আগ্রহ কম ছিল না বরং বেশি ছিল। বড় শট নিতে গিয়ে পিছলে পড়ে যাওয়া, ল্যাঙ মেরে একজন আরেকজনকে ফেলে দিয়ে গড়াগড়ি খাওয়া ছিল আরও মজার বিষয়। দুরন্তপনা এমন ছিল যে কার হাত পা ভাঙলো সেই ঝুঁকির কথাও আমরা মাথায় রাখতাম না। প্যাক কাদায় একাকার হয়ে যখন চোখ লাল করে বাড়ি ফিরতাম তখন আরেক দফা বকুনি খেতাম মা নানুর কাছে।
বর্ষা নিয়ে যে যাই বলুক। পুঁজিবাদীরা হয়তো বলবে অনুতপাদনশীলতার মাস। আমার কাছে বর্ষা হলো ঘরে বসে থাকার মাস, ঝিমানোর মাস, কল্পনা করার অজস্র সময়ের মাস, অতলে হারানোর মাস, গভীরে যাওয়ার মাস, গল্প করার ও গল্প বানানোর মাস। এ ঋতু আমাদেরকে যতটা সম্পর্কের গভীরে নেয়, বোধের অতলে নেয়, অন্য কোনো ঋতু তা পারে না। পারিবারিক খুনসুটি, গ্রামীন প্রবাদ প্রবচন, ও উপকথাগুলো বর্ষাকালেই বেশি তৈরি হয়। মানুষ অবসরে বসে সম্পর্কের ইতিউতি ধরে ঘটনার অনুষঙ্গ সব বিচার বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত ধীর গতিতে মনোজগতে খেলতে পারে। খেলার মাধ্যমেই তৈরি হয় আমাদের সব গ্রামীন কিচ্ছা কাহিনী। বাদাম ভাজা বা ফাস্ট ফুড নয়, বর্ষায় আমরা খেতাম সীমের বিচি, কুমড়ার দানা বাজা। চাল ভাজা বা গম ভাজা ইত্যাদি চিবিয়ে চিবিয়ে আলসে সময় পার করতাম। শুয়ে শুয়ে মনুষ্য বায়ুর গন্ধে কাথার ভেতর গরম হয়ে যেতো। তবু সকল কাজিন মিলে কাথার তলে শুয়ে গল্প আর খুনসুটি শেষ হতো না। মাঝে মাঝে যোগ দিতেন মা খালা নানু দাদুরা। তখন তাঁদের ভেতর থেকে বের হতো রূপকথার খেলা, সাথে প্রবাদ প্রবচন। এভাবেই বংশপরস্পরায় লোকজ শ্লোক বা প্রবাদগুলো টিকে থাকে জনপদে।
বর্ষায় ঘরের কোণে চালের পানি পড়ার দৃশ্য সত্যিই অন্যরকম। কচু পাতায় বৃষ্টির পানি, আম জাম গাছের কাক ভেজা, দুর্বা ঘাসের বৃষ্টি ভেজা, ফসলি ক্ষেতের সবুজ ভেজা রূপ, আর খালে বিলের ঝিরঝির বাতাসে জলের কাঁপন, আর সাগরের ঢেউ- প্রতিটি রূপই আলাদা। আবার মানুষ ভেদেও বর্ষা ধরা দেয় ভিন্ন রূপে। যে কৃষক ঘরে বসে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ শুনে, আর যে কৃষক জমিতে বৃষ্টির মধ্যে কাজ করে – দুজনের বৃষ্টি উপভোগ ভিন্ন হয়। যে গৃহবধু ঘরে কাজ করে আর যে গৃহবধু পুকুরে নেমে সাঁতার কাটে তাদের অনুভূতি ভিন্ন হয়। তেমনি কিশোরদের দুরন্তপনা, কিশোরীদের উম্মত্ততা, কিংবা বড়দের ষোলকুটি খেলা বা পাশা খেলার আনন্দ আলাদা হয়। পেশা, বয়স ও লিংগভেদে বর্ষার উপভোগ ভিন্ন ভিন্ন হয়।
এখনকার মতো ছাতার মেলা ছিল না। কোনো বাড়িতে ছাতা ছিল, কোনো বাড়িতে ছিল না। কৃষকরাতো গোলপাতার পাতলা ব্যবহার করতেন। আত্মীয় কারও বাড়িতে গেলে বৃষ্টি এলে ছাতা ধার করেই ফিরতে হতো। সেই ছাতা ফেরত নিয়ে ঝগড়াও কম নয়। এ প্রসংগে তারাপদ রায়ের লেখা চিঠিটি স্মর্তব্য
‘‘প্রিয় মেঘনাথবাবু,
গত শনিবার রাতে খুব বৃষ্টির সময় আমার বাড়ি থেকে ফিরে যাবার জন্যে আমাদের চাকর পাশের বাড়ি থেকে যে ছাতাটি আপনাকে এনে দিয়েছিল, সেই ছাতাটি পাশের বাড়ির ভদ্রলোক আজ চাইতে এসেছিলেন। ভদ্রলোক বললেন, ছাতাটি তিনি তাঁর অফিসের বড়বাবুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছিলেন, বড়বাবুকে বাড়বাবুর ভায়রা ভাই খুব চাপ দিচ্ছেন ছাতাটির জন্য, কারণ বড়বাবুর ভায়রাভাই যে বন্ধু কাছ থেকে ছাতাটি আনেন সেই বন্ধুর মামা তার ছাতাটি ফেরত চাইছেন। শুনলাম ছাতাটি নাকি মামাবাবুরও নিজের নয়, তাঁর শশুরের।
ইতি তারাপদ রায়
বৃষ্টি নিয়ে আমার আবেগ অনুভূতি কিংবা আদিখ্যেতার কোনো শেষ নেই। এখন ঢাকার আধুনিক যুগে খিচুড়ি বিফ ভর্তা দিয়ে বর্ষার আমেজ উপভোগ করি। কদাচিত ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজলেও ঠান্ডা লাগার ভয়ে সাঁটিয়ে থাকি। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন করি। সাথে সাথে রবি ঠাকুরের ‘আষার‘ কবিতা আওড়াই। ‘‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’ অথবা ‘বর্ষার দিনে’ কবিতার লাইন মনে মনে জঁপি ‘‘এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘনঘোর বরিষায়/ এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরঝরে/ তপনহীন ঘন তমসায়।’‘ গ্রামে গেলে বিস্তর জলরাশি ও ঢেউ খেলানো ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়েও রবি ঠাকুরকে পাই। ‘সোনার তরী‘তে তিনি এঁকেছেন ‘‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা/ কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা/ রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা/ ভরা নদী ক্ষুরধারা খর-পরশা/ কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।’‘
বর্ষাকালে বৃষ্টি দেখলেই শুধু ভাবনা আর কল্পনা উঁকি দেয় মনে। সবকিছু কেমন যেন স্থবির হয়ে পড়ে। রবি ঠাকুরের ‘অপেক্ষা’ কবিতায় এমন সুর শুনি, ‘মেঘেতে দিন জড়ায়ে থাকে মিলায়ে থাক মাঠে/ পড়িয়া থাকে তরুর শিরে/ কাঁপিতে থাকে নদীর নীড়ে/ দাঁড়ায়ে থাকে দীর্ঘ ছায়া মেলিয়া ঘাটে বাটে।’‘ শুধু তাই নয়, বৃষ্টি আমার মনে বেদনাও জাগায়। কিছুতেই মন ধরে রাখতে পারি না। তখনও রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় নিই । ‘‘আমার পরানে আজি যে বাণী উঠিছে বাজি/ অবিরাম বর্ষণধারে/ কারণ শুধায়ো না, অর্থ নাহি তার/ সুরের সঙ্কেত জাগে পুঞ্জিত বেদনার।’‘ তবু মন বর্ষাকেই ডাকে, বর্ষাকেই বরণ করে ঠাকুরের ভাষায় ‘‘এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে এসো কর স্নান নবধারাজলে‘‘। আরও কত শত গান বাদলমুখর দিনে-রাতে মাতাল করে। একপ্রকার মাদকতা সৃষ্টি করে। শ্রাবণ আর রবীন্দ্রনাথ একসুরে গাঁথা। বর্ষার ফোঁটা পড়লেই গেয়ে উঠি, ‘‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/ পাগল আমার মন জেগে ওঠে।’‘ তাছাড়া ‘‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না…‘’ রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় এ গানটি মন উচাটন করে তোলে, বিরহী করে তোলে। প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী/ উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে/ নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণ সঙ্গীতে/ রিমঝিম রিমঝিম…’, এমন গান শুনতে শুনতে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি প্রকৃতিতে, বর্ষায়, মেঘের মধ্যে। সানন্দে গেয়ে যাই, ‘‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে/ তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ/ তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে/ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ।’‘
আমাদের বর্ষাপ্রীতিকে আরও জাগিয়ে দিতে কবি নজরুলও কম যান নি। ‘‘এই বাদল ঝড়ে/ হায় পথিক কবি ঐ পথের পরে/আর কতকাল রবি, ফুল দলিবি কত/হায় অভিমান ভরে‘‘ কিংবা অন্যত্র নজরুল বলেছেন, ‘‘সেই বসন্ত ও বরষা আসিবে ফিরে ফিরে / আসিবে না আর ফিরে অভিমানী মোর ঘরে‘‘। এভাবেই দিন যায়, রাত যায়। তবু মনের আকুতি শেষ হয় না। যেমন করে নজরুল বলেছেন ‘‘বরষা ফুরায়ে গেল আশা তবু গেল না ‘‘
সকলের মন উদাসী করে বর্ষা প্রত্যেককে আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে যাক, এ প্রত্যাশা রইলো।
